ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ কার্যকরের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল কেন্দ্রীয় সরকার। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন একটি প্যানেল বা কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র মারফত জানা গেছে, এই অতিরিক্ত কমিটি মূলত রাজ্যে ঝুলে থাকা আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে দ্রুত অনুমোদনের কাজ করবে। মূলত এসআইআর (SIR) অনুশীলনের মধ্যেই এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে যা প্রশাসনিক স্তরে বড় ধরনের পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিঃশর্ত নাগরিকত্বের দাবি জানিয়ে আসছেন। উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল ও প্রতীক্ষা রয়েছে। নতুন এই প্যানেলটি মূলত জেলা স্তরে কাজ করবে এবং যারা ইতিপূর্বেই অনলাইনে আবেদন করেছেন কিন্তু নানা আইনি জটিলতায় বা নথি সংক্রান্ত সমস্যায় আটকে আছেন, তাদের বিষয়টি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেখবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ‘এটি একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা যা রাজ্যে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুততর করবে।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে সিএএ কার্ড খেলা বিজেপি সরকারের অন্যতম কৌশল ছিল। এখন সেই আইনের প্রায়োগিক দিকটিকে বাস্তবায়িত করতে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানো হচ্ছে। বনগাঁ এবং রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রের মতুয়া ভোটারদের কাছে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্য সরকার শুরু থেকেই এই আইনের বিরোধিতা করে আসলেও কেন্দ্রীয় সরকার তার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে পোর্টালের মাধ্যমে সরাসরি আবেদন গ্রহণ করছে। নতুন এই কমিটি গঠনের ফলে স্থানীয় স্তরে যারা সরকারি সহায়তা পাচ্ছিলেন না, তারা এখন কেন্দ্রীয় নোডাল অফিসারদের অধীনে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন। আবেদনের সংখ্যা এবং প্রমাণের সত্যতা যাচাইয়ে এই কমিটির রিপোর্টই হবে চূড়ান্ত ভিত্তি। বর্তমানে সারা দেশে সিএএ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও মতুয়াদের বড় একটি অংশ এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। এই প্যানেলের মূল দায়িত্ব হবে আবেদনকারীদের আদি বাসস্থানের প্রমাণ এবং ভারতে প্রবেশের সময়কাল সম্পর্কিত তথ্যগুলো খতিয়ে দেখা। সূত্র বলছে, এসআইআর বা স্ট্যাটাস ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টের মাধ্যমে যে তদন্ত প্রক্রিয়া চলে, তাকে আরও সহজ করতেই এই অতিরিক্ত কমিটির অন্তর্ভুক্তি। এতে করে দীর্ঘসূত্রিতা কমবে এবং প্রকৃত শরণার্থীরা দ্রুত ভারতীয় পাসপোর্ট ও ভোটার কার্ডের জন্য বিবেচিত হবেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও স্পষ্ট করেছে যে, আবেদনকারীদের কোনোভাবেই হয়রানি করা হবে না বরং তাদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহে সহযোগিতা করবে এই বিশেষ সেল। পশ্চিমবঙ্গের মতো জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের রাজ্যে এই ধরণের পদক্ষেপ তৃণমূল বনাম বিজেপি দ্বৈরথকে আরও উসকে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনিকভাবে সরকার চাইছে কোনো ত্রুটি ছাড়াই যেন নাগরিকত্ব সনদ প্রদান করা যায়। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই কমিটির সদস্যরা ব্লক ও মহকুমা স্তরে গিয়ে সরেজমিনে কাজ শুরু করতে পারেন বলে প্রাথমিক খবরে জানা গেছে। সিএএ পোর্টালে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ আবেদন করেছেন যার সিংহভাগই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। এই বিপুল পরিমাণ ডেটা প্রসেসিং করার জন্য পুরনো পরিকাঠামো যথেষ্ট ছিল না বলেই এই নতুন প্যানেলটি আনা হয়েছে। মতুয়া ঠাকুরবাড়ির পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়াকে সহজ করার দাবি জানানো হচ্ছিল। শান্তনু ঠাকুরের মতো বিজেপি সাংসদরা এই উদ্যোগকে তাদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো এই প্যানেল গঠনকে আইনি লড়াইয়ের বিষয় হিসেবে দেখছে। সব মিলিয়ে সিএএ বাস্তবায়নের পথে এই নতুন কমিটি একটি মাইলফলক হতে পারে। আবেদনকারীদের নথির ঘাটতি থাকলে কীভাবে বিকল্প উপায়ে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়েও কমিটি সুপারিশ করবে। সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী কয়েক মাসের মধ্যে একটি বড় অংশের আবেদনকারীকে নাগরিকত্বের শংসাপত্র হস্তান্তর করা। এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ডিজিটালাইজেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জেলাশাসকদের বদলে কেন কেন্দ্রীয় প্যানেলকে ক্ষমতা দেওয়া হলো তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার সিদ্ধান্তে অটল। রাজ্য প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপে এই কাজ শেষ করতে চায় দিল্লি।








