নীরব মোদীর প্রত্যর্পণ আদেশে স্বাক্ষরকারী ব্রিটিশ এমপি-র পদক্ষেপে ‘অত্যন্ত ক্ষুব্ধ’ ভারত

হীরক ব্যবসায়ী নীরব মোদির প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়ে ভারত সরকারের চরম অসন্তোষের কথা প্রকাশ্যে এসেছে। লন্ডনের কারাগারে বন্দী ৫৫ বছর বয়সী এই পলাতক ব্যবসায়ীর ভারতে ফিরে আসা নিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসনের ধীরগতিতে নয়াদিল্লি যে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, তা ফের একবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন ব্রিটেনের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র সচিব প্রীতি প্যাটেল। পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক জালিয়াতি কাণ্ডের মূল অভিযুক্ত নীরব মোদিকে ভারতে ফিরিয়ে আনার আইনি লড়াইয়ে বারবার বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

প্রীতি প্যাটেল, যিনি দীর্ঘ সময় ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি জানিয়েছেন যে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে ভারতের সরকারি মহলে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া না মেলায় ভারতের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। উল্লেখ্য, প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র সচিব হিসেবে থাকাকালীন তিনি নিজেই নীরব মোদির প্রত্যর্পণ আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মোদির ভারতের মাটিতে পা রাখা সম্ভব হয়নি, যা ভারত-ব্রিটেন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।

বর্তমানে লন্ডনের কারাগারে বন্দী নীরব মোদি নিজেকে বাঁচানোর জন্য আইনি ব্যবস্থার প্রতিটি ফাঁকফোকর ব্যবহার করছেন। তিনি মানবিকতার খাতিরে বা শারীরিক সমস্যার দোহাই দিয়ে বারবার প্রত্যর্পণ আটকাতে উচ্চতর আদালতে আবেদন জানাচ্ছেন। তার এই কৌশলী আইনি লড়াইয়ের কারণে ভারতের তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর দীর্ঘ পরিশ্রম সত্ত্বেও বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে।

প্রীতি প্যাটেলের অভিযোগ অনুযায়ী, ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থা এবং সরকারি প্রক্রিয়ার জটিলতা নীরব মোদির মতো অপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, ভারত সরকার বারবার এই বিষয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা লন্ডনে নিযুক্ত ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের কাছে জানিয়েছে। ভারতের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, আর্থিক জালিয়াতির মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত নীরব মোদির এই দীর্ঘ কারাবাস এবং প্রত্যর্পণে অহেতুক বিলম্ব ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার ওপর এক প্রকার আঘাত।

লন্ডনের কারাগারে থাকা নীরব মোদি বর্তমানে কী পরিস্থিতিতে রয়েছেন, তার সঠিক আপডেট বা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই। তবে ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত পর্যায়টি যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। যদিও ভারতের তরফে কূটনৈতিক স্তরে চাপ বজায় রাখা হচ্ছে, তবুও ব্রিটিশ আইন আদালত যেভাবে সময় নিচ্ছে, তাতে করে আগামী দিনে এই প্রক্রিয়া আরও কতটা দীর্ঘায়িত হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

ভারতের অর্থনৈতিক অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে নীরব মোদির মামলাটি একটি নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিয়ে বিদেশে পালানোর পর তাকে দেশে ফেরানো ভারতের জাতীয় সম্মানের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ রাজনীতির অন্দরমহলে এই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। প্রীতি প্যাটেলের এই বক্তব্য ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে বলে মনে করছে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। ভারত-ব্রিটেন প্রত্যর্পণ চুক্তির সীমাবদ্ধতাগুলিও এই মামলার মাধ্যমে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। নীরব মোদির মতো হাই-প্রোফাইল মামলার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে তা ভবিষ্যতে অন্য অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

আগামী দিনে ব্রিটিশ সরকার নীরব মোদির প্রত্যর্পণ ত্বরান্বিত করতে কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নেয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে ভারতীয় প্রশাসন। আপাতত লন্ডন কারাগারই হয়ে উঠেছে নীরব মোদির স্থায়ী ঠিকানা, কিন্তু ভারতের আদালতের মুখোমুখি হওয়া থেকে তিনি আর কতদিন নিজেকে দূরে রাখতে পারবেন, তা নিয়ে বড়সড় সংশয় তৈরি হয়েছে। ভারতের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা বারবার জানিয়েছেন যে, অপরাধী যেই হোক না কেন, দেশের আইন থেকে তাকে রেহাই দেওয়া হবে না। তাই নীরব মোদির প্রত্যর্পণ এখন কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে এক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।