একইসঙ্গে দু’জায়গায় থাকা অসম্ভব: বিএলওদের ক্ষোভ

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)দের দু’টি ভিন্ন স্থানে একই সময়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, একই সময়ে দু’টি ভিন্ন স্থানে থাকা কি আদৌ সম্ভব? এই অমানবিক নির্দেশিকা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন তাঁরা।

সূত্রের খবর, বিগত কয়েক বছর ধরেই বিএলওদের উপর কাজের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য নির্বাচন দফতরের তরফ থেকে ক্রমাগত নতুন নতুন দায়িত্ব তাঁদের উপর চাপানো হচ্ছে। ভোট প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনা থেকে শুরু করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, পুরনো ভোটারদের তথ্য সংশোধন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ – এমন নানা ধরনের কাজ করতে হয় তাঁদের। এর পাশাপাশি, সাম্প্রতিককালে বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী সময়ে, ভোটার তথ্য যাচাই এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ আরও জোরদার হয়েছে। এই কাজগুলি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং শ্রমসাধ্য।

তাঁদের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে তাঁরা বিভিন্ন ধরনের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ এবং কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। সেই প্রশিক্ষণগুলিও হয়েছে বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন স্থানে। প্রশিক্ষণের পর এবার তাঁদের এমন একটি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যা তাঁদের কাছে একেবারেই অবাস্তব বলে মনে হচ্ছে। একজন বিএলও একই সময়ে দুটি আলাদা বুথে পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। যদি কোনো কারণে একজন বিএলওকে দুটি বুথের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তাঁকে সাধারণত অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী বা অন্য কোনো কর্মীর সাহায্য নিতে হয়। কিন্তু বর্তমানে যে নির্দেশিকা এসেছে, তাতে তাঁদের একটিমাত্র সত্তা হিসেবেই দুটি ভিন্ন স্থানে উপস্থিত থাকার কথা বলা হচ্ছে।

বিএলওদের একাংশের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি বুথের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী থাকা আবশ্যক। একজন কর্মী একই সময়ে দু’টি ভিন্ন বুথে উপস্থিত থাকতে পারেন না। যদি কোনো বুথে পর্যাপ্ত কর্মী না থাকেন, তাহলে কমিশন বা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিকদের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু এই ধরনের নির্দেশিকা দিয়ে তাঁদের উপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে শুধু তাঁদের শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমই বাড়ছে না, বরং নির্বাচনী কাজের গুণগত মানও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএলও জানিয়েছেন, ‘আমরা দু’জন সাধারণ মানুষ নই যে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে উপস্থিত থাকতে পারি। আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এই নির্দেশিকা আমাদের পেশাগত জীবনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আমরা এই নির্দেশিকার পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছি।’

আরেকজন বিএলও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নির্বাচনের কাজ অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রতিটি পদক্ষেপ নিখুঁত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যখন আমাদের উপর এমন অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, তখন ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন আমাদের পরিস্থিতি বুঝুক এবং বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা জারি করুক।’

তাঁদের মতে, এই সমস্যা সমাধানের জন্য নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রতিটি বুথের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মীর সংস্থান নিশ্চিত করা। বিকল্পভাবে, যদি কোনো বিএলওকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে তার জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। শুধু নির্দেশ দিয়ে দায় সারা হলে চলবে না, তার বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতাও দেখতে হবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএলওদের এই ক্ষোভ অযৌক্তিক নয়। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিএলওদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কাজের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং তাঁদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে নির্বাচন কমিশনের নীতি নির্ধারণ করা উচিত। এই ধরনের নির্দেশিকা একদিকে যেমন কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেয়, তেমনই অন্যদিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

বর্তমানে, এই নির্দেশিকার বিরুদ্ধে বিএলও সংগঠনগুলির মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁরা আগামী দিনে এই বিষয়ে আরও বড় আন্দোলনের পথে হাঁটতে পারেন বলেও শোনা যাচ্ছে। তাঁদের মূল দাবি, এই নির্দেশিকা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং বিএলওদের কাজের চাপ কমাতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।

13 COMMENTS

Comments are closed.