দক্ষিণ কলকাতায় ডিজিটাল গ্রেফতারের ফাঁদে পড়ে খোয়া গেল ২৯ লক্ষ টাকা

কলকাতা শহরের বুকে আবারও ডিজিটাল গ্রেফতারের আতঙ্ক। এক প্রৌঢ়কে দীর্ঘ সময় ধরে ফোনে আটকে রেখে প্রায় ২৯ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাইবার প্রতারকদের বিরুদ্ধে। দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি বর্তমানে চরম মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। ঘটনাটি সামনে আসতেই শহরজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রাজ্য প্রশাসনের তরফে বারবার সচেতন করার পরেও একের পর এক এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা।

জানা গিয়েছে, গত কয়েক দিন আগে ওই ব্যক্তির কাছে একটি ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে নিজেকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দেয় এক ব্যক্তি। প্রতারক ওই প্রৌঢ়কে জানায় যে, তাঁর নামে একটি মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের হয়েছে। শুধুমাত্র তাই নয়, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে বেশ কিছু নথিপত্রও দেখানো হয়। এরপরই ওই ব্যক্তিকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ভয় দেখানো শুরু হয়। প্রতারকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, যতক্ষণ না তদন্ত শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি ভিডিও কলের মাধ্যমে তাদের নজরদারিতে থাকবেন।

প্রৌঢ়ের পরিবার সূত্রে খবর, ওই ব্যক্তি কার্যত মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি যেন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন, সেজন্য তাকে ক্রমাগত চাপের মুখে রাখা হয়েছিল। ভয়ে এবং আতঙ্কে ওই ব্যক্তি প্রতারকদের নির্দেশ অনুযায়ী নিজের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২৯ লক্ষ টাকা তাদের দেওয়া নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন। টাকা হস্তান্তরের পরই প্রতারকদের ফোন বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তখন ওই প্রৌঢ় বুঝতে পারেন যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

ঘটনার পর ওই ব্যক্তি স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। লালবাজারের সাইবার অপরাধ দমন শাখাও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই চক্রটি ভিনরাজ্য বা দেশের সীমানার বাইরে থেকে এই জালিয়াতি পরিচালনা করছে। যেহেতু ডিজিটাল গ্রেফতারের বিষয়টি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, তাই সাধারণ মানুষকে কোনো সন্দেহজনক ফোন এলে তৎক্ষণাৎ স্থানীয় থানায় খবর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকেও সাইবার জালিয়াতি রুখতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কাজ চলছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই বিষয়টিকে প্রশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরে সরব হয়েছে।

উল্লেখ্য, বর্তমান রাজ্য সরকার সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত কয়েক মাসে বহু মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ এই ধরনের ডিজিটাল গ্রেফতারের ফাঁদে পড়ে খোয়া গিয়েছে। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলির তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে, যেগুলোতে ওই প্রৌঢ় টাকা পাঠিয়েছিলেন। পাশাপাশি, ওই প্রতারকদের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ জানিয়েছে, আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করে প্রতারকদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।

প্রবীণ নাগরিকদের লক্ষ্য করেই এই চক্রগুলো বেশি সক্রিয় হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। অনেক সময় হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও তারা ভুয়া সমন পাঠিয়ে থাকে। পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, কোনো কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারি সংস্থা ভিডিও কলে ডিজিটাল গ্রেফতার করে না। এই ধরনের কোনো বার্তা বা ফোন এলে আতঙ্কিত না হয়ে নিকটস্থ সাইবার থানায় যোগাযোগ করাই শ্রেয়। তদন্তকারী আধিকারিকরা মনে করছেন, চক্রটির শিকড় অনেক গভীরে এবং একাধিক জাল নথিপত্র ব্যবহার করে তারা এই অপরাধমূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ওই ব্যক্তি এবং তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে।