৮৭ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানালেন বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা মনোজ কুমার (Manoj Kumar)। মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মনোজ কুমার, যিনি ভারত কুমার নামে পরিচিত, ১৯৩৭ সালের ২৪ জুলাই অবিভক্ত ভারতের অ্যাবোটাবাদে (বর্তমান পাকিস্তান) জন্মগ্রহণ করেন এবং তার আসল নাম ছিল হরিকৃষ্ণ গিরি গোস্বামী। তিনি হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের এমন একজন অভিনেতা, প্রযোজক এবং পরিচালক ছিলেন, যিনি অনেক দেশাত্মবোধক ছবিতে কাজ করেছিলেন। তার জীবন এবং কর্মজীবনের সাথে সম্পর্কিত অনেক অকথ্য ঘটনা রয়েছে, যা তার সংগ্রাম, অনুপ্রেরণা এবং ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে।
শহীদ এবং ভগত সিং থেকে অনুপ্রেরণা
মনোজ কুমার (Manoj Kumar) বিপ্লবী ভগত সিং দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে ‘শহীদ’ ছবিতে ভগত সিং-এর ভূমিকায় অভিনয় করার পর, একজন দেশপ্রেমিক অভিনেতা হিসেবে তার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ছবিটি দেখার পর, ভগত সিংয়ের মা বলেছিলেন যে তুমি দেখতে হুবহু আমার ছেলের মতো। এই বক্তব্য শুনে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এটি ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় সম্মান।
দেশভাগের যন্ত্রণা এবং শরণার্থী শিবিরের অভিজ্ঞতা
মনোজ কুমার ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের দুঃখজনক সময় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। যখন তার বয়স ১০ বছর, তখন তার পরিবার পাকিস্তান থেকে দিল্লিতে চলে আসে। এই সময় তিনি কিংসওয়ে শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে যখন তার মা এবং ছোট ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন তিনি হাসপাতালে কোনও সাহায্য পাননি। রাগের বশে তিনি ডাক্তার ও নার্সদের মারধর করেছিল, যার ফলে তার বাবা তাকে হিংসা না করার শপথ নিতে বাধ্য করেছিলেন। এই ঘটনাটি তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
পুলিশের লাঠিচার্জ এবং ক্ষুব্ধ আচরণ
দেশভাগ-পরবর্তী পরিস্থিতি মনোজ কুমারকে (Manoj Kumar) অসন্তুষ্ট করেছিল। একবার, রাগের বশে কিছু করার সময়, তাকে পুলিশের লাঠিচার্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবে, তার বাবার কাছ থেকে শপথ নেওয়ার পর, তিনি তার রাগ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন এবং কখনও হিংসার আশ্রয় নেননি।
নাম পরিবর্তনের গল্প
মনোজ কুমার (Manoj Kumar) ছোটবেলা থেকেই দিলীপ কুমার এবং অশোক কুমারের ভক্ত ছিলেন। এই অভিনেতাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তার নাম হরিকৃষ্ণ থেকে মনোজ কুমার রাখেন। চলচ্চিত্রে আসার পর, তার দেশপ্রেমিক ভাবমূর্তি তাকে ‘ভারত কুমার’ উপাধি এনে দেয়।
ভিক্ষুক চরিত্রে চলচ্চিত্র জীবন শুরু
মনোজ কুমার ১৯৫৭ সালে ‘ফ্যাশন’ ছবি দিয়ে তার চলচ্চিত্র জীবন শুরু করেন, যেখানে তিনি ৮০ বছর বয়সী একজন ভিক্ষুকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এটি ছিল তার প্রথম পদক্ষেপ, যা পরবর্তীতে তাকে তারকাখ্যাতিতে নিয়ে যায়। ১৯৬০ সালে ‘কাঁচ কি গুড়িয়া’-তে তিনি প্রথম মুখ্য ভূমিকা পান।
লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
‘শহীদ’ ছবিটি দেখার পর, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মনোজ কুমারের (Manoj Kumar) সাথে দেখা করেন এবং তার ‘জয় জওয়ান জয় কিষাণ’ স্লোগানের উপর একটি চলচ্চিত্র তৈরির পরামর্শ দেন। মনোজ কুমার এই অনুপ্রেরণাকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলেন এবং দিল্লি থেকে মুম্বাই যাওয়ার ট্রেন যাত্রার সময় ‘উপকার’-এর গল্পটি লিখে ফেলেছিলেন। ছবিটি সুপারহিট হয় এবং তিনি বেশ কয়েকটি পুরষ্কার জেতেন।
জরুরি অবস্থার বিরোধিতা এবং ছবি নিষিদ্ধ
জরুরি অবস্থার সময় মনোজ কুমার সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। তার ‘রোটি কাপড়া অউর মকান’ ছবিটি সামাজিক সমস্যা উত্থাপনের কারণে কিছু সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এটি তার নির্ভীক ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়।