কলকাতাঃ পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলির উপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে মতুয়া সম্প্রদায়। উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়ার বিভিন্ন মতুয়া গোষ্ঠী তাদের নিজেদের সংগঠনে থাকা নেতৃবৃন্দ এবং সক্রিয় কর্মীদের প্রার্থী করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে কারণ, তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যারা দলের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে আসছেন, সংগঠনের কার্যনির্বাহী স্তরে রয়েছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না এবং প্রার্থী তালিকায় তাঁদের স্থান দেওয়া হচ্ছে না।
সম্প্রদায়ের এই দাবি রাজনৈতিক দলগুলির, বিশেষ করে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র জন্য এক বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় দলই মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটব্যাঙ্কের উপর নির্ভর করে এবং এই নির্বাচন তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই, মতুয়াদের এই অসন্তোষকে উপেক্ষা করার কোনও ঝুঁকি তারা নিতে চাইছে না। সূত্রের খবর, উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়ার বিভিন্ন প্রান্তে মতুয়া সম্প্রদায়ের একাধিক গোষ্ঠী এই বিষয়ে একটি অভিন্ন দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। তাঁদের মূল অভিযোগ, স্থানীয় স্তরে যারা সংগঠনকে ধরে রেখেছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছেন এবং দলের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বরং, কিছু ক্ষেত্রে বাইরের লোককে বা যারা অতীতে দলের সঙ্গে সেভাবে যুক্ত ছিলেন না, তাঁদের টিকিট দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা মতুয়া সমাজের মূল সংগঠনগুলিকে ক্ষুব্ধ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, মতুয়াদের কয়েকটি গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তারা জানিয়েছে, যদি তাদের দাবি মানা না হয় এবং সম্প্রদায়ের সক্রিয় নেতাদের প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন না দেওয়া হয়, তবে তারা পৃথকভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ভাববে। কেউ কেউ আবার বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলির উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, যদি তাঁদের প্রতিনিধিত্ব না থাকে, তবে তাঁরা কেন অন্যদের সমর্থন করবেন?
তৃণমূল কংগ্রেসের মতুয়া নেতাদের একাংশ এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। তাঁরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীদের অবহেলা করলে তা দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। মতুয়াদের একটি বড় অংশ, যারা এতদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচার ও সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের দাবি, এবার অন্তত তাঁদের সুযোগ দেওয়া উচিত। সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের পদাধিকারীরা, যারা মাঠে নেমে কাজ করেন, তাঁদের উপেক্ষা করা হলে মতুয়া ভোটব্যাঙ্কের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বিজেপি-র অন্দরেও একই সুর শোনা যাচ্ছে। মতুয়া সম্প্রদায়ের যে অংশ বিজেপি-র সঙ্গে যুক্ত, তারাও তাদের নেতাদের টিকিট দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের আশঙ্কা, যদি মতুয়াদের নিজেদের লোক প্রার্থী না হয়, তবে নির্বাচনে মতুয়া ভোট অন্য দিকে চলে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে, রাজনৈতিক দলগুলি এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে যেমন নিজেদের বিধায়ক বা প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে, তেমনই মতুয়া সম্প্রদায়ের ক্ষোভ প্রশমিত করে তাঁদের ভোট নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মতুয়াদের এই দাবিকে কেন্দ্র করে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়া জেলার মতো যেসব আসনে মতুয়া ভোট একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে, সেখানে এই পরিস্থিতি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। দলগুলিকে তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে, যাতে কোনও পক্ষকেই অসন্তুষ্ট না করে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
মতুয়া সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলি চাইছে, তাদের মূল স্রোতের নেতাদের প্রার্থী করা হোক, যারা দীর্ঘ সময় ধরে সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করছেন। তাঁদের মতে, এই ধরনের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিধানসভাতে মতুয়াদের স্বার্থের কথা ভালোভাবে তুলে ধরতে পারবেন। কিন্তু বর্তমানে কোন কোন দল মতুয়াদের এই দাবি মানতে রাজি হবে এবং এই চাপের মুখে তাদের রাজনৈতিক কৌশল কী হবে, তা সময়ই বলবে। তবে, একটি বিষয় স্পষ্ট, মতুয়াদের এই দাবি রাজ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং আগামী দিনগুলিতে এই বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা ও দর কষাকষি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো দল কবে এবং কার সঙ্গে আলোচনায় বসবে, অথবা এই দাবি পূরণের শেষ সময়সীমা কবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তবে, রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই অচলাবস্থার একটি সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হবে, কারণ নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই দলগুলির উপর এই চাপ বাড়ছে।








