ভোটপ্রচারে শুভেন্দুর ‘এসআইআর’ নিদান, বিজেপি-র বাজি ভোটার তালিকা

কলকাতাঃ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক প্রচার তুঙ্গে উঠছে। এই আবহে বিজেপি-র অন্যতম তারকা প্রচারক, নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এক অভিনব প্রচার কৌশল সামনে এনেছেন। এবার তাঁর নিশানায় ভোটার তালিকা এবং তা থেকে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বাদ দেওয়া। তিনি এই প্রক্রিয়াকে একটি ‘এসআইআর’ (SIR) নিদান হিসেবে উল্লেখ করে ভোটারদের মধ্যে নতুন করে সাড়া ফেলেছেন।

শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘এসআইআর’ নিদান আসলে তিনটি বিষয়কে নির্দেশ করে। প্রথমত, ‘এস’ (S) বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ‘সাইলেন্ট’ (Silent) ভোটারদের। অর্থাৎ, যারা এতদিন ধরে চুপচাপ ছিলেন কিন্তু এবার বিজেপির পক্ষে ভোট দেবেন। দ্বিতীয়ত, ‘আই’ (I) দিয়ে বোঝানো হয়েছে ‘ইনফরমড’ (Informed) ভোটারদের। অর্থাৎ, যারা রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের ব্যর্থতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত এবং তাই পরিবর্তন চাইছেন। এবং সবশেষে, ‘আর’ (R) দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন ‘রেজিস্টার্ড’ (Registered) ভোটারদের, যারা বৈধভাবে এই রাজ্যের ভোটার। তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি কার্যত ভোটারদের একটি নির্দিষ্ট অংশের কাছে আবেদন জানাচ্ছেন, যারা এখনও নিজেদের ভোটদানের ব্যাপারে নিশ্চিত নন বা যারা রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।

বিজেপি-র এই কৌশল মূলত ভোটার তালিকা থেকে অবৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়ার উপর জোর দিচ্ছে। দলটির অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের সুবিধার জন্য রাজ্যের ভোটার তালিকায় বহু বহিরাগত বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই বিজেপি আগামী নির্বাচনে তাদের ‘ভোট ভাগ্যের’ চাবিকাঠি হিসেবে ভোটার তালিকাকেই ব্যবহার করতে চাইছে। তাদের মূল লক্ষ্য হল, এই ‘অনুপ্রবেশকারী’ ভোটগুলি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া, যাতে রাজ্যের আসল ভোটারদের ভোটেই বিজেপি জয়লাভ করতে পারে। এই ‘ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ’ (Voter List Purification) প্রক্রিয়াকে তারা নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে দেখছে।

বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বারংবার অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, রাজ্যের শাসক দল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য ভোটার তালিকায় কারচুপি করেছে। তাদের মতে, এই কারচুপির ফলে রাজ্যের বহু যোগ্য ভোটার তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অন্যদিকে অবৈধ ভোটাররা নির্বাচনে প্রভাব ফেলছেন। শুভেন্দু অধিকারীর ‘এসআইআর’ নিদান এই অভিযোগগুলিকেই আরও জোরালো করেছে এবং ভোটারদের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে যে, তাদের ভোটদানের অধিকার সুরক্ষিত করতে এবং রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বিজেপি-র উপর আস্থা রাখা উচিত।

এই নির্বাচনী কৌশলের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে যে, বিজেপি শুধু ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বাদ দেওয়ার পক্ষেই সওয়াল করছে না, বরং যারা ‘সাইলেন্ট’ ভোটার হিসেবে পরিচিত, অর্থাৎ যারা এতদিন ভোটদানে তেমনভাবে সক্রিয় ছিলেন না, তাঁদেরও এবার সক্রিয় করে তোলার চেষ্টা করছে। এই ‘সাইলেন্ট’ ভোটারদের ভোটদানের জন্য উৎসাহিত করার মাধ্যমে তারা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের ভোটারের মন জয় করার পরিকল্পনা করছে। বিশেষত, শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রাম বাংলার সেই সব অংশে যেখানে বিজেপির প্রভাব কিছুটা কম, সেখানে এই কৌশল কার্যকরী হতে পারে বলে দল মনে করছে।

অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘ইনফরমড’ ভোটারদের বিষয়টি। বিজেপি মনে করছে, রাজ্যের বর্তমান সরকার এবং তাদের নীতি সম্পর্কে যারা অবগত, তারা নিশ্চয়ই পরিবর্তন চাইবেন। তাই এই সমস্ত ‘ইনফরমড’ ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে তারা বিশেষভাবে সচেষ্ট। অর্থনৈতিক মন্দা, কর্মসংস্থান সংকট, এবং রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে তারা লাগাতার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়গুলি তুলে ধরে তারা ভোটারদের বোঝাতে চাইছে যে, একমাত্র বিজেপি-ই পারে এই সব সমস্যার সমাধান করতে এবং বাংলাকে সোনালী অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি-র এই ‘এসআইআর’ কৌশলটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একদিকে যেমন ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা আনার বার্তা দিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে নতুন ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও একটি প্রয়াস। তবে, এই কৌশল কতটা কার্যকরী হবে তা সময়ই বলবে। নির্বাচন কমিশনের উপরও চাপ সৃষ্টি করার একটি পরোক্ষ চেষ্টাও এর মধ্যে নিহিত রয়েছে, যাতে তারা ভোটার তালিকা যাচাইয়ের ব্যাপারে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়।

বিগত নির্বাচনগুলিতে দেখা গেছে যে, ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ প্রায়শই ওঠে। কিন্তু বিজেপি এবার এটিকে তাদের মূল প্রচারের হাতিয়ার বানিয়েছে। ‘এসআইআর’ – সাইলেন্ট, ইনফরমড এবং রেজিস্টার্ড ভোটারদের মাধ্যমে তারা একটি বার্তা দিতে চাইছে যে, তাদের লক্ষ্য শুধু জয়লাভ নয়, বরং একটি সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। এই নির্বাচনী প্রচারের ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য বিজেপি-র এই অভিযোগগুলিকে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা বারবারই দাবি করেছে যে, ভোটার তালিকা সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সেখানে কোনও রকম কারচুপির সুযোগ নেই। তবে, বিজেপি-র এই নতুন প্রচার কৌশল রাজ্যের নির্বাচনী সমীকরণে কী প্রভাব ফেলবে, তা দেখার বিষয়। আগামী দিনগুলিতে রাজনৈতিক প্রচার আরও তীব্র হবে এবং ভোটারদের মন জয় করার জন্য দলগুলি তাদের সব ধরনের কৌশলই প্রয়োগ করবে। শুভেন্দু অধিকারীর ‘এসআইআর’ নিদান সেই দীর্ঘ লড়াইয়েরই একটি অংশ মাত্র।