প্রণব বিশ্বাস, নৈহাটি: ভোরের সাইরেনটা আজ আর বাজেনি। শনিবার সাতসকালে কারখানার গেটে একটিমাত্র কাগজের টুকরো— ‘সাসপেনশন অব ওয়ার্কস’-এর নির্মম নোটিস— এক লহমায় অন্ধকার নামিয়ে এনেছে কয়েক হাজার শ্রমিকের জীবনে। নৈহাটি জুটমিলের দরজা আচমকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এই খেটে-খাওয়া মানুষগুলো। একদিকে বকেয়া মজুরি না পাওয়ার যন্ত্রণা, অন্যদিকে আগামীকাল সংসারের উনুন জ্বলবে কি না—সেই ঘোর অনিশ্চয়তা গ্রাস করেছে তাঁদের। মিল কর্তৃপক্ষের আকস্মিক সিদ্ধান্ত এবং শ্রমিক সংগঠনগুলির রাজনৈতিক তরজার জাঁতাকলে পড়ে আজ হাজার হাজার শ্রমিক পরিবারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক নিদারুণ বাস্তব— হাহাকার এবং চরম দারিদ্রের ভ্রুকুটি।
কী জানাচ্ছে মিল কর্তৃপক্ষ?
শনিবার সকালে মিলের গেটে ঝোলানো নোটিশে কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, বাজারে পাটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। সেই সঙ্গে রয়েছে উৎপাদন সংক্রান্ত নানাবিধ সমস্যা। এই জোড়া সংকটের কারণেই সাময়িকভাবে জুটমিলের কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি উড়িয়ে সরব শ্রমিক সংগঠন:
মিলের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ ফেটে পড়েছেন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। কর্তৃপক্ষের দেওয়া পাটের অভাবের যুক্তি মানতে তাঁরা একেবারেই নারাজ।
পর্যাপ্ত পাট মজুত রয়েছে: শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের পালটা দাবি, মিলের ভিতরে এখনও বেশ কয়েকদিন উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত কাঁচা পাট মজুত রয়েছে। ফলে শুধুমাত্র পাটের অভাবের অজুহাত দেখিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের রুটিরুজিতে কোপ মারার এই সিদ্ধান্ত কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তৃণমূল ইউনিয়নকে নিশানা বিএমএস-এর: মিলের এই দুরবস্থার জন্য সরাসরি পূর্বতন শাসকদলের শ্রমিক সংগঠনকেই দায়ী করেছে ভারতীয় মজদুর সংঘ (বিএমএস)। বিএমএস-এর সম্পাদক ধর্মেন্দ্র যাদব তোপ দেগে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে মিল পরিচালনা এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে পদে পদে গাফিলতি করা হয়েছে। প্রাক্তন তৃণমূল শ্রমিক ইউনিয়নের সেই ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং দুর্নীতির ফলেই আজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।”
যদিও নেতাদের বক্তব্যের মাঝেও আসল কান্নাটা কাঁদছেন সাধারণ শ্রমিকরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের অনেক বকেয়া প্রাপ্য মেটানো হয়নি। অন্যান্য আর্থিক দাবিদাওয়াও ঝুলে রয়েছে। সেইসব না মিটিয়েই রাতারাতি মিল বন্ধ করে দেওয়ায় তাঁদের সংসার চালানোই এখন চরম দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলেমেয়েদের মুখে কীভাবে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেবেন, সেই আশঙ্কায় প্রহর গুনছেন শ্রমিকরা।
এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে অবিলম্বে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তাঁরা। নৈহাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি ফের কবে খুলবে, আদৌ খুলবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন প্রশাসনের দিকেই চাতকের মতো তাকিয়ে রয়েছেন হাজার হাজার অভাবী শ্রমিক।








