রাজ্যে প্রথম পেঁচা গণনা: ১৩ জেলায় মিলল ১১ প্রজাতির অস্তিত্ব

পশ্চিমবঙ্গ বন দপ্তরের উদ্যোগে এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহযোগিতায় রাজ্যে প্রথমবারের মতো আয়োজিত পেঁচা গণনায় অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘ চার মাস ধরে চলা এই বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় রাজ্যের মোট ১৩টি জেলা থেকে ১১ প্রজাতির পেঁচার অস্তিত্ব রেকর্ড করা হয়েছে। প্রকৃতিবিদ এবং বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় পেঁচাদের ভূমিকা অপরিসীম, অথচ এই নিশাচর পাখিদের নিয়ে এর আগে সেভাবে কোনো বিস্তারিত সমীক্ষা হয়নি।

বন দপ্তরের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে রাজ্যের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল, গ্রামীণ এলাকা এবং জলাভূমি সংলগ্ন অঞ্চলে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ এলাকা থেকে শুরু করে উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল এবং রাঢ় বাংলার বনভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির পেঁচা তাদের স্বাভাবিক আবাসে বসবাস করছে। যে ১১টি প্রজাতির পেঁচার হদিশ মিলেছে, তাদের মধ্যে রয়েছে বার্ন আউল, স্পটেড আউল এবং ফিশ আউলের মতো পরিচিত প্রজাতি। যদিও কিছু বিরল প্রজাতির পেঁচাও ক্যামেরাবন্দি হয়েছে বা তাদের ডাক রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই সমীক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল পেঁচাদের সংখ্যা নির্ধারণের পাশাপাশি তাদের বাসস্থান এবং খাদ্যশৃঙ্খলে তাদের অবস্থানের ওপর নজর রাখা। দ্রুত নগরায়ন এবং কৃষিক্ষেত্রে অত্যধিক কীটনাশকের ব্যবহার কীভাবে এই পাখিদের জীবনচক্রকে প্রভাবিত করছে, তা নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবীরা ১৩টি জেলার প্রতিটি ব্লকে ঘুরে ঘুরে রাত জেগে এই তথ্য সংগ্রহ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি এবং শব্দ শনাক্তকারী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে যাতে কোনো প্রজাতিই নজর এড়িয়ে না যায়।

বন দপ্তরের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, রাজ্যের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে নিশাচর শিকারি পাখি হিসেবে পেঁচার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে কৃষিজমি থেকে ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষতিকারক প্রাণী দমনে পেঁচারা প্রাকৃতিকভাবেই সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু জনসচেতনতার অভাব এবং কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে অনেক সময় এই পাখিদের ক্ষতি করা হয়। এই সমীক্ষার রিপোর্ট আগামী দিনে রাজ্যের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সমীক্ষা চলাকালীন দেখা গেছে যে, কিছু জেলায় প্রাকৃতিক আবাসের পরিবর্তনের কারণে পেঁচাদের সংখ্যা কিছুটা কমেছে, অন্যদিকে কিছু সংরক্ষিত এলাকায় এদের বংশবৃদ্ধির হার স্থিতিশীল রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই পাখিদের ওপর কতটা পড়ছে, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আগামী দিনে রাজ্যের অন্য জেলাগুলোতেও এই ধরনের সমীক্ষা সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে বন দপ্তরের।

রাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সমীক্ষার ফলাফল একটি বিস্তারিত নথিপত্র বা ‘অ্যাটলাস’ আকারে প্রকাশ করা হবে। এতে প্রতিটি প্রজাতির পেঁচার আলাদা আলাদা ভৌগোলিক বিস্তার এবং তাদের বর্তমান অবস্থার বিশদ বর্ণনা থাকবে। এই প্রকল্পটি পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃতিপ্রেমী এবং গবেষকদের কাছে আগামী দিনে একটি বড় দিশা হিসেবে কাজ করবে। রাজ্যের ১৩টি জেলায় এই বিপুল কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করার জন্য স্থানীয় স্তরে বনকর্মীদের পাশাপাশি বন সচেতনতা কমিটির সদস্যদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমানে পেঁচাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বন দপ্তরের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ আবেদন জানানো হয়েছে। বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী পেঁচা শিকার বা তাদের কেনাবেচা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই সমীক্ষা শুধু তথ্য সংগ্রহের কাজ নয়, বরং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নিশাচর এই পাখিদের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলার প্রচেষ্টাও চালানো হচ্ছে। রাজ্যের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে পরিবেশবাদী মহলের একাংশ। সামগ্রিকভাবে, এই সমীক্ষা রাজ্যের পরিবেশ সংরক্ষণের ইতিহাসে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।