পশ্চিমবঙ্গে ভোটার সংখ্যা ১৬ শতাংশ কমে ৬.৪৪ কোটি: নির্বাচন কমিশন

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার (Special Internal Review) মাধ্যমে এই বিশাল সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যানুসারে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ৬৩ লক্ষেরও বেশি নামের মধ্যে মূলত দ্বৈত নাম, মৃত ভোটার এবং ঠিকানা পরিবর্তনকারী ব্যক্তিদের আধিক্য রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই বিশাল ছাঁটাই প্রক্রিয়ার ফলে রাজ্যজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করাই এই দীর্ঘমেয়াদী পর্যালোচনার প্রধান লক্ষ্য ছিল। বিভিন্ন জেলায় এই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ চলাকালীন স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অনেক অভিযোগ জমা পড়েছিল। বিশেষ করে উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং বীরভূমের মতো জনবহুল জেলাগুলিতে ভোটার তালিকায় ব্যাপক অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়েছিল। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO) প্রতিটি বাড়ি ঘুরে তথ্য যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করেছেন। তবে শুধুমাত্র নাম বাদ দেওয়াই নয়, প্রায় ৬০ লক্ষ নাম বর্তমানে ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার অধীনে রাখা হয়েছে। এই ভোটারদের নথিপত্র এবং বসবাসের প্রমাণ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। জেলা নির্বাচনী আধিকারিকরা জানিয়েছেন, এই ৬০ লক্ষ নামের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারিত হবে পরবর্তী ধাপে তথ্যের সঠিকতা যাচাই করার পর। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই বিষয়টিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের হয়রানির অভিযোগও উঠেছে। রাজ্যের ভোটার তালিকায় দীর্ঘকাল ধরে ভুয়া বা ‘ভুতুড়ে’ ভোটার থাকার যে অভিযোগ ছিল, কমিশনের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তা অনেকাংশে দূর হবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে একই ভোটারের নাম একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে বা একই কেন্দ্রের একাধিক বুথে নথিভুক্ত ছিল। ডিজিটাল ডাটাবেস ব্যবহারের মাধ্যমে এই ল্যাপটপ বা সফটওয়্যার ভিত্তিক অডিট করে ডুপ্লিকেশন ধরা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এই কড়া অবস্থান আগামী লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভোটার তালিকা নিয়ে যে বিতর্ক বরাবরই ছিল, সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় ভোটার তালিকায় নাম কাটা যাওয়া নিয়ে বিক্ষোভও হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাস করলেও কেন তাদের নাম বাদ দেওয়া হল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা কমিশনের দেওয়া উচিত। এই পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কমিশন অভিযোগ নিরসন সেল (Grievance Redressal Cell) সক্রিয় করেছে। যেখানে কোনো ভোটার অযৌক্তিক কারণে বাদ পড়লে পুনরায় আবেদন করতে পারবেন। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর এখন সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী কৌশল পুনর্গঠন করতে বাধ্য হচ্ছে। ভোটার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় অনেক আসনের জনতাত্ত্বিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে। কমিশনের এই শুদ্ধিকরণ অভিযানের ফলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা আগের তুলনায় অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভুল হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল গত বছরের শেষের দিকে এবং একাধিক পর্যায়ে তথ্য যাচাইয়ের পর এই চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশ্যে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাজ্যে ভোটার তালিকায় ১৬ শতাংশের এই বিশাল পতন আগামী দিনে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা আনবে বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের বিশ্বাস।