রাজ্যের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে এবার বড়সড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কলকাতার রাজপথ থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের প্রধান রাস্তাগুলিতে টোটোর অবাধ গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশিকা জারি করা হচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো টোটো গুলিকে কেবল ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ বা শেষ প্রান্তের যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। এর ফলে ব্যস্ত সময়ে প্রধান সড়কগুলিতে গাড়ির গতি স্বাভাবিক থাকবে এবং দুর্ঘটনাজনিত ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছে পরিবহন দপ্তর।
দীর্ঘদিন ধরেই শহর এবং মফস্বলের রাস্তাগুলিতে টোটোর অপরিকল্পিত চলাচল নিয়ে সাধারণ মানুষ এবং যান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। যত্রতত্র টোটো দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা এবং মূল সড়কের মোড়ে মোড়ে ভিড় জমিয়ে যানজট সৃষ্টির ফলে দৈনন্দিন যাতায়াতে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। রাজ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় টোটোগুলিকে সুনির্দিষ্ট রুটে চলার জন্য অনুমতি দেওয়া হবে এবং মূল বা ধমনী সদৃশ রাস্তাগুলিতে এদের উপস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
পরিবহন দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, টোটো মূলত স্বল্প দূরত্বে যাত্রী পরিবহনের জন্য অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, এগুলি দীর্ঘ দূরত্বের পথেও চলাচল করছে, যা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। নতুন বিধিনিষেধ অনুযায়ী, যে সমস্ত টোটো নির্দিষ্ট রুট পারমিট বা নিয়ম না মেনে প্রধান রাস্তায় চলাচল করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং ট্রাফিক পুলিশকে এই বিষয়ে বিশেষ তদারকি করতে বলা হয়েছে।
যদিও অনেক টোটো চালক এবং মালিকদের অভিযোগ, এই নিয়মের ফলে তাদের উপার্জনের পথ সংকুচিত হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, জনস্বার্থ এবং যান চলাচল সচল রাখা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ইতিমধ্যে বিভিন্ন পুরসভা এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে নতুন রুট ম্যাপিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকল্প রাস্তার সন্ধান দেওয়া হবে যাতে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে এবং টোটো চালকরাও তাদের পেশা বজায় রাখতে পারেন।
এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে শহরের যানজট কতটা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নিয়ে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী, তবে তার সঠিক বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জনবহুল এলাকাগুলিতে যেখানে সংকীর্ণ রাস্তায় টোটো ছাড়া অন্য কোনো গণপরিবহন সহজে প্রবেশ করতে পারে না, সেখানে এই নিয়ম কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত গাইডলাইন প্রয়োজন।
বর্তমানে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এই নিয়ম পর্যায়ক্রমে চালু করার প্রক্রিয়া চলছে। যেসব রুটে টোটো চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে, সেখানে নির্দিষ্ট যাত্রী শেড এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করারও প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রশাসনের তরফ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে যে, সাধারণ মানুষ যেন ট্রাফিক আইন মানার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন। এছাড়া, বেআইনিভাবে টোটো চালানোর প্রবণতা রোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।
পরিশেষে, পরিবেশবান্ধব যান হিসেবে টোটোর উপযোগিতা অনস্বীকার্য হলেও, শৃঙ্খলাহীন চলাচল কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী দিনে কলকাতার যান চলাচলের মানচিত্রে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিষয়ে আরও বিশদ প্রশাসনিক নির্দেশাবলী বা পরবর্তী পর্যায়ক্রমিক রূপরেখা বর্তমানে আমাদের কাছে উপলব্ধ নেই, যা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট করা হবে।








