গণপরিবহণে ট্র্যাকিং ডিভাইস বিভ্রাট: আটকে যাচ্ছে সিএফ সার্টিফিকেট

কলকাতা শহরের রাজপথে চলাচলকারী বাস, মিনিবাস ও অন্যান্য বাণিজ্যিক যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট বা সার্টিফিকেট অফ ফিটনেস (সিএফ) নবীকরণ প্রক্রিয়ায় এক ভয়াবহ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। মূলত কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী বাণিজ্যিক যানবাহনে ভেহিকল লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস (VLTD) এবং প্যানিক বাটন লাগানো বাধ্যতামূলক করার পর থেকেই এই সংকটের সূত্রপাত। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বহু যানবাহনের ট্র্যাকিং ডিভাইস সচল থাকা সত্ত্বেও সরকারি ডাটাবেসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে মোটর ভেহিকল ইন্সপেক্টররা চাইলেও ফিটনেস ক্লিয়ারেন্স দিতে পারছেন না। পরিবহন মালিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে হাজার হাজার গাড়ি বর্তমানে রাস্তায় নামতে পারছে না। নিয়ম অনুযায়ী, যে সমস্ত গাড়িতে ভিএলটিডি ডিভাইস লাগানো আছে, সেই ডিভাইসের ডেটা সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভার ‘বাহন’ পোর্টালে প্রতিফলিত হতে হবে। কিন্তু সার্ভারের মন্থর গতি এবং অনেক ক্ষেত্রে ডিভাইসের আইএমইআই নম্বর শনাক্ত করতে না পারার কারণে সিএফ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি থমকে যাচ্ছে। পরিবহন দপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, ব্যাক-এন্ড সিস্টেমে কিছু কারিগরি ত্রুটি রয়েছে যা মেরামতের কাজ চলছে। এদিকে পরিবহন মালিকরা অভিযোগ করছেন, ফিটনেস নবীকরণ না হওয়ায় তাদের প্রতিদিন জরিমানার মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে, সিএফ না থাকলে বিমা কোম্পানিগুলোও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দাবি প্রত্যাখ্যান করছে, যা বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। কলকাতার মিনিবাস অপারেটরদের মতে, আগে সিএফ করানোর প্রক্রিয়াটি অনেকটা সরল ছিল, কিন্তু নতুন এই ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি এবং যথাযথ পরিকাঠামোর অভাবে এটি এখন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পুরনো বাসগুলোতে এই নতুন প্রযুক্তি খাপ খাওয়াতে সমস্যা হচ্ছে। কারিগরি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় সিম কার্ডের নেটওয়ার্ক সমস্যা বা ডিভাইসের হার্ডওয়্যার ত্রুটির কারণে ডেটা ট্রান্সমিশন ব্যাহত হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ডিলাররা যে ডিভাইসগুলি লাগিয়েছেন সেগুলি সরকারি পোর্টালের সাথে সঠিকভাবে ম্যাপ করা নেই। এই জটিলতার সমাধানের জন্য পরিবহন দপ্তর একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। তবে যতক্ষণ না পর্যন্ত এই সার্ভার সংক্রান্ত সমস্যা মেটে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাণিজ্যিক যানবাহন মালিকদের দুর্ভোগ কমার কোনো লক্ষণ নেই। পরিবহন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দাবি, যতক্ষণ এই ডিজিটাল সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হচ্ছে, ততক্ষণ যেন ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সিএফ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় অথবা এই সময়ের জন্য ধার্য জরিমানা মকুব করা হয়। বর্তমানে কলকাতার রাস্তায় বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনেও এটি একটি অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সমস্যা আরও তীব্র হবে। সরকারি বাসের তুলনায় বেসরকারি বাসের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এই সমস্যার প্রভাব সরাসরি মধ্যবিত্তের পকেটে পড়ছে, কারণ কম সংখ্যক গাড়ি থাকায় অটো বা রিকশা চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকছেন। সামগ্রিকভাবে, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে জননিরাপত্তা বাড়ার কথা থাকলেও, পরিকাঠামোগত দুর্বলতায় তা এখন সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।