তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুকুল রায় প্রয়াত, শোকস্তব্ধ বঙ্গ রাজনীতি

কাঁচড়াপাড়া: বাংলার রাজনীতির এক বর্ণময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল। সোমবার গভীর রাতে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুকুল রায়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেনছিলেন। রাজনীতির ময়দানে তিনি কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ঠ সেনাপতিই  না, বরং তৃণমূল কংগ্রেসকে একটি শক্তিশালী সংগঠনে রূপ দেওয়ার মূল কারিগরও ছিলেন। ১৯৯৭ সালে যখন জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন যে হাতেগোনা কয়েকজন বিশ্বস্ত সঙ্গী তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, মুকুল রায় ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। উত্তর চব্বিশ পরগনার কাঁচরাপাড়ার সাধারণ এক রেল কর্মচারীর পরিবার থেকে উঠে এসে দিল্লির ক্ষমতা অলিন্দে নিজের জায়গা করে নেওয়া মুকুল রায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল উত্থান-পতনে ভরা। ইউপিএ-২ সরকারের আমলে তিনি কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর দলের দ্বিতীয় শক্তিশালী নেতা হিসেবে গণ্য হতেন তিনি। তবে ২০১৭ সালে আকস্মিকভাবে তিনি তৃণমূল ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগদান করেন। বিজেপিতে যাওয়ার পর তিনি দলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পান এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেন। যদিও নির্বাচনের ফল প্রকাশের ঠিক পরেই তিনি পুনরায় পুরনো দল তৃণমূলে ফিরে আসেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূলের বুথ স্তর থেকে রাজ্য স্তরের সংগঠন সাজানোর ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। প্রতিটি কর্মীর নাম তাঁর নখদর্পণে থাকত, যা তাঁকে একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠকে পরিণত করেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং তিনি রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেকে দূরে সরে যান। তাঁর প্রয়াণে বাংলার রাজনীতির একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এক শোকবার্তায় জানিয়েছেন যে, মুকুল রায়ের অভাব বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবসময় অনুভূত হবে। তাঁর মৃত্যুতে রাজ্য রাজনীতির সমস্ত স্তরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিরোধী দলের নেতারাও তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রশংসা করে শোকজ্ঞাপন করেছেন। মুকুল রায় শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি পর্দার আড়ালে থেকে রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারতেন। তাঁর ছেলে শুভ্রাংশু রায় বর্তমানে বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন। মুকুল রায়ের মরদেহ কলকাতার বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সোজা নিয়ে যাওয়া হয় রাজভবনে সেখানে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। রাজভবন থেকে মুকুল বাবুর মরদহ নিয়ে যাওয়া হবে তার কাঁচরাপাড়ার বাসভবন ‘যুগল রেখা’ এ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে যাবেন মুকুল রায়ের কাঁচরাপাড়ার বাসভবনে এবং হালিশহর রামপ্রসাদ মহাশ্মশান ঘাটে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা পর্যন্ত থাকবেন বলে জানা গিয়েছে। ইতিমধ্যেই কাঁচরাপাড়া ফটিকপাড়ায় মুকুল বাবুর বাসভবনে ভিড় জমিয়েছেন সাধারণ মানুষ ও কর্মী-সমর্থকরা তাঁদের প্রিয় ‘মুকুল দা’-কে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলার রাজনীতিতে মুকুল রায়ের মতো কুশলী সংগঠক এবং পরিস্থিতি বিচারে রণকৌশল নির্ধারণকারী নেতা খুব কমই এসেছেন। তাঁর স্মৃতি রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে থেকে যাবে।