যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরমহলে ফের বাড়ছে প্রশাসনিক চাপানউতোর। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চশিক্ষা প্রকল্প ‘ইনস্টিটিউট অফ এমিনেন্স’ বা আইওই তকমা পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং পিএম-উষা প্রকল্পের রূপরেখা তৈরির জন্য যে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডিনদের একাংশ। শিক্ষাবিদদের এই বড় অংশের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের স্বৈরাচারী মনোভাবের কারণেই বারবার ব্যাহত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই প্রকল্প। তাদের দাবি, কোনো রকম আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক রীতির পরিপন্থী।
দীর্ঘদিন ধরে আইওই তকমা পাওয়ার জন্য লড়াই চালাচ্ছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এটি বাস্তবায়িত হলে বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনুদান পাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে, যা গবেষণার মানোন্নয়নে বড় ভূমিকা নেবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ জটিলতায় এই তকমা পাওয়ার প্রক্রিয়া বারবার হোঁচট খাচ্ছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পিএম-উষা প্রকল্পের রূপায়ণের জন্য যে বিশেষ প্যানেল তৈরি করেছে, তা নিয়েও অধ্যাপক মহলে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিভাগীয় প্রধান ও ডিনদের মতামত নেওয়া আবশ্যিক, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক। তাদের অভিযোগ, পিএম-উষা প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। প্রশাসনিক মহলের এই গাফিলতির জেরে শেষ পর্যন্ত সাধারণ পড়ুয়ারা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের মতে, কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ইশারায় এই কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসনকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজ্যে বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকাঠামো ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ছিল বলে শাসক দল অভিযোগ করে, তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে বলেই মত একাংশের। বর্তমান শাসক দল বিজেপি মনে করছে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ‘অশুভ শক্তি’ উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই পরিস্থিতির জন্য সরকারের হস্তক্ষেপকেই দায়ী করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা উচ্চপদস্থ কর্তারা এই বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, দ্রুত এই জট না কাটলে কেন্দ্রীয় অনুদান পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়বে। অধ্যাপক ও ডিনদের দাবি, বর্তমান কমিটি বাতিল করে অবিলম্বে সর্বসম্মত ভিত্তিতে নতুন কমিটি গঠন করতে হবে। তাদের স্পষ্ট কথা, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং আলোচনার টেবিলই একমাত্র সমাধান।
কলকাতা তথা রাজ্যের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম রয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে। সেই সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে আইওই এবং পিএম-উষার মতো প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন কতটা জরুরি, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তারা কবে এই দাবি মেনে নেন, বা আদৌ কোনো মীমাংসা সূত্র বেরিয়ে আসে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আপাতত গোটা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এই নিয়ে প্রবল উত্তেজনা বিরাজ করছে। অধ্যাপক ও শিক্ষকদের এই অনড় অবস্থান আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর রেখেছেন ওয়াকিবহাল মহল। শিক্ষা মহলের একাংশের মতে, এই বিরোধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই রাজ্য সরকারের উচ্চশিক্ষা রূপায়ণের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে।








