ঐতিহাসিক নিউ মার্কেট চত্বরে ফের প্রকাশ্যে এল হকার এবং স্থায়ী ব্যবসায়ীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত দ্বন্দ্ব। গত শুক্রবার দুপুরের দিকে এস এন ব্যানার্জি রোড এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে পথচারীদের চলাচলের জায়গা দখল এবং অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি পার্কিংয়ের সমস্যা নিয়ে পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিকভাবেই এই বাণিজ্যিক এলাকাটি কলকাতার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, কিন্তু সাম্প্রতিক কালে সেখানে হকারদের অবৈধ জবরদখল নিয়ে স্থায়ী ব্যবসায়ীরা লাগাতার ক্ষোভ জানিয়ে আসছিলেন।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, রাস্তা এবং ফুটপাথের বড় অংশ হকাররা কার্যত দখল করে নিয়েছে। এর ফলে দোকানের সামনে ক্রেতাদের পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লেনদেন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দোকান মালিকদের একাংশের দাবি, তাদের দোকানের সামনের দৃশ্যমানতা সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, হকারদের পাল্টা দাবি, তারা দীর্ঘদিনের রুজি-রুটির প্রশ্নে এই এলাকাতেই ছোট ছোট অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তাদের মতে, পুনর্বাসন ছাড়া তাদের এই জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া অমানবিক।
পরিস্থিতি শুক্রবার বেলা বাড়ার সাথে সাথে এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় থেকে শুরু করে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। খবর পেয়েই লালবাজারের নির্দেশনায় বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিউ মার্কেট থানার পুলিশকে বিশেষ নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাস্তা দখলমুক্ত করার দাবিতে এদিন স্থায়ী ব্যবসায়ীরা দীর্ঘক্ষণ বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের অভিযোগ, কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও হকার উচ্ছেদ বা সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। উল্টে দিনের পর দিন ফুটপাথের দখলদারি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনো জরুরি প্রয়োজনে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা বা অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি পরিষেবার গাড়ি ঢোকাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এটি সাধারণ নাগরিকদের জীবনের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকা হবে। রাজ্যের বর্তমান প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী, শহরের যানজট নিরসন এবং ফুটপাথ দখলমুক্ত করার বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অতীতে এই ধরনের জবরদখল নিয়ে অনেক রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও, বর্তমান সরকার সমস্যার স্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, যথাযথ পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ছাড়া কেবল উচ্ছেদের মাধ্যমেই এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির এক প্রবীণ সদস্য আক্ষেপের সুরে জানিয়েছেন, “আমরা কোনোভাবেই হকারদের জীবিকা কেড়ে নেওয়ার পক্ষে নই, কিন্তু রাস্তার ওপর দোকান বসিয়ে যেভাবে আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। ক্রেতারা রাস্তায় নামতে ভয় পাচ্ছেন, এবং পুরো এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার বারোটা বেজেছে।” অন্যদিকে, হকার ইউনিয়নের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের রুজি-রুটি কেড়ে নেওয়ার যেকোনো ষড়যন্ত্র তারা আন্দোলনের মাধ্যমেই রুখে দেবেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ আধিকারিকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এলাকাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে পুনরায় না ঘটে, তার জন্য এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে। নিউ মার্কেট এলাকাটি দীর্ঘ সময় ধরে কলকাতার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় এখানে। এই জবরদখলের ফলে প্রতিদিন যে যানজট তৈরি হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষ ও নিত্যযাত্রীদের কাছে নিত্যদিনের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জোরালো দাবি, আসন্ন উৎসবের মরশুমের আগে ক্রেতাদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে এলাকাটি দখলমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। পুরসভা এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই হয়তো কোনো বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর। তবে আপাতত দুই পক্ষের এই রেষারেষিতে চরম আতঙ্কে রয়েছেন সাধারণ ক্রেতা এবং পথচারীরা। ঘটনার বিশদ তদন্ত চলছে এবং অশান্তি ছড়ানোর অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে। প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা শহর।








