এয়ার ফোর্স ওয়ানে সিএনএন-কে জায়গা দিল না হোয়াইট হাউস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনকালে তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের যে বৈরী সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম নিদর্শন ছিল সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর ওপর আরোপ করা বিধিনিষেধ। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, এয়ার ফোর্স ওয়ানে সিএনএন-এর জন্য নির্ধারিত যে আসনটি থাকে, তাতে তাদের প্রতিনিধিকে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবং তৎকালীন প্রশাসনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সাধারণত প্রেসিডেন্ট যখন অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক সফরে যান, তখন তাঁর সঙ্গে নির্বাচিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের একটি বিশেষ দল বা ‘প্রেস পুল’ ভ্রমণ করে। সিএনএন-এর অভিযোগ ছিল যে, দশকের পর দশক ধরে চলে আসা প্রথা ভেঙে তাদের সংবাদসংস্থাকে এই সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগ থেকে পরিকল্পিতভাবে দূরে রাখা হয়েছে।

সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রেসিডেন্টের বিমানে ভিডিও পুলের জন্য যে নির্দিষ্ট স্থান সংরক্ষিত থাকে, সেখানেই সিএনএন-এর প্রতিনিধিদের জায়গা পাওয়ার কথা ছিল। তবে হোয়াইট হাউসের এই সিদ্ধান্তে সেই দীর্ঘদিনের রীতি ব্যাহত হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্মিলিত দাবি ছিল, মুক্ত সাংবাদিকতা এবং তথ্য পাওয়ার অধিকারে এটি সরাসরি একটি আঘাত। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য এই সিদ্ধান্তের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ তখনো পর্যন্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। সংবাদসংস্থাটির পক্ষ থেকে সেই সময় জানানো হয়েছিল যে, তারা এই বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে, তবে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছিল, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত জটিল। এর আগেও বিভিন্ন সময় ট্রাম্প সরাসরি সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং তাদের ‘জনগণের শত্রু’ হিসেবে অভিহিত করে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সিএনএন-এর মতো প্রভাবশালী একটি নেটওয়ার্ককে এয়ার ফোর্স ওয়ানে জায়গা না দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা ছিল, প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান আগামী দিনে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের পথকে রুদ্ধ করতে পারে।

উল্লেখ্য যে, এয়ার ফোর্স ওয়ানে কার কার জায়গা হবে, তা মূলত হোয়াইট হাউস প্রেস অফিসের নির্ধারিত নিয়মাবলির ওপর নির্ভর করে। সাধারণত রোটেশন বা পালাবদল পদ্ধতিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে এই সুযোগ দেওয়া হয় যাতে সব পক্ষ সমানভাবে প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডের খবর সংগ্রহের সুযোগ পায়। সিএনএন-এর জায়গা অন্য কোনো সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল কি না বা এই বর্জন প্রক্রিয়া ঠিক কতদিন স্থায়ী হবে, সে বিষয়ে তখন বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউসের এই কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখার প্রবণতা এবং সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলার নীতি মার্কিন সাংবাদিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল।

এই ইস্যুতে হোয়াইট হাউসের কোনো মুখপাত্রের তরফ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বা সন্তোষজনক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি মার্কিন সংবাদ মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে থাকে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতার প্রশ্নে এই ঘটনা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত ছিল। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিটি বিদেশ সফরের সময় প্রেস পুলের গঠন নিয়ে অতীতেও নানা মতান্তর দেখা দিয়েছিল। সিএনএন-এর মতো আন্তর্জাতিক স্তরের একটি সংবাদমাধ্যমকে এভাবে দূরে সরিয়ে দেওয়া ভবিষ্যতে মুক্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি খারাপ উদাহরণ হিসেবে গণ্য হবে বলে বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করেছিলেন।

পরিস্থিতিটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর কেড়েছিল, কারণ এর মাধ্যমে মার্কিন গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বা সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে সংবাদমাধ্যমকে দূরে রাখার এই কৌশল কার্যত জনস্বার্থের পরিপন্থী বলে গণ্য করা হয়। পরবর্তী দিনগুলোতে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান সংবাদমাধ্যমের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে এবং গণমাধ্যমগুলো কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল ছিল। মূলত ক্ষমতার দম্ভ এবং সত্য প্রকাশের দায়বদ্ধতার এই লড়াইয়ে সিএনএন-কে বাদ দেওয়া ছিল একটি প্রতীকী পদক্ষেপ, যা প্রশাসনের অসহিষ্ণুতারই পরিচয় বহন করে। সেই সময়কার ঘটনা আজও সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়, যা শাসকের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে এই ঘটনাটি ছিল স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার এক চরম সংকট।