ঐতিহাসিক পার্ক স্ট্রিটের বুক চিরে এবার বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আলো ছড়াতে চলেছে এক নতুন আমেজে। কলকাতার অন্যতম আইকনিক জায়গা অ্যালেন পার্কে এই প্রথমবার দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে, যা শহরবাসীর মধ্যে এক অভাবনীয় উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ‘কলকাতা সনাতনী সংঘ’ নামের একটি নতুন উদ্যোক্তা গোষ্ঠী এই পুজোর মূল আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই পুজোকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক উৎসাহ এবং কৌতুহল দেখা দিয়েছে, কারণ পার্ক স্ট্রিটের মতো জায়গায় দুর্গাপূজার আয়োজন সচরাচর দেখা যায় না।
রাজনৈতিক মহলের খবর অনুযায়ী, এই সংঘের নেতৃত্বে রয়েছেন বিজেপির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী। রাজ্যের বর্তমান শাসক দল বিজেপির এই উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে বেশ শোরগোল পড়েছে। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পার্ক স্ট্রিটের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকায় এমন একটি পুজো আয়োজন করা তাদের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তাদের মূল লক্ষ্য হলো, বাঙালির চিরাচরিত ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার এক অনবদ্য মেলবন্ধনে এই পুজোকে কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দর্শনীয় স্থানে পরিণত করা। তারা চান, পার্ক স্ট্রিটের আভিজাত্য আর দুর্গাপূজার ভক্তি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাক।
পুজোর প্রতিটি পর্বে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে সগৌরবে তুলে ধরার বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে এক বিশেষ আরতির আয়োজন করা হবে। বারাণসীর গঙ্গা আরতির আদলে এই আরতি অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করা হবে, যা পার্ক স্ট্রিটের দৈনন্দিন ব্যস্ততায় এক নতুন আধ্যাত্মিক আমেজ নিয়ে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। আলোকসজ্জা এবং প্যান্ডেলের সাজসজ্জায় মাটির গন্ধ ও চিরাচরিত বাংলা সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট থাকবে বলে নিশ্চিত করেছেন উদ্যোক্তারা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে আলোর কারসাজি থাকলেও, মূল ভাবনাটি থাকবে শিকড়ের দিকে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিশেষ চমক থাকছে। প্রতিদিন স্থানীয় সংগীত এবং লোকশিল্পের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে, যাতে নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও কলাকুশলীরা নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুবর্ণ সুযোগ পান। কলকাতার দুর্গাপূজা বর্তমানে ইউনেস্কোর অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। সেই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পার্ক স্ট্রিটের মতো অভিজাত এলাকায় এই নতুন পুজোর সংযোজনকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং আশা করছেন এটি পর্যটন মানচিত্রে কলকাতার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অন্যদিকে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনামল শেষ হওয়ার পর বর্তমানে রাজ্যে বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠিত। বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস এই উৎসব আয়োজনের প্রতিটি খুঁটিনাটির ওপর কড়া নজর রাখছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। পুজোর নিরাপত্তা, ভিড় সামলানো এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে কলকাতা পুলিশের তরফ থেকে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে শহরবাসীর। আয়োজকরা জানিয়েছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে তারা পুলিশ প্রশাসনের সাথে নিয়মিত সমন্বয় রক্ষা করে চলেছেন।
পার্ক স্ট্রিটে এই প্রথমবার দুর্গাপূজা হওয়ায় ব্যবসায়িক ও পর্যটন মহলেও দারুণ উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। উৎসবের মরসুমে প্রচুর মানুষ এখানে ভিড় করবেন এবং আশেপাশের দোকান ও রেস্তোরাঁগুলোতেও ব্যবসার জোয়ার আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পুজোর দিনক্ষণ, প্রতিমার শৈল্পিক রূপ এবং মণ্ডপের অভ্যন্তরীণ অন্যান্য খুঁটিনাটি বিস্তারিত তথ্য এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ্যে আনা হয়নি। উদ্বোধনের দিনক্ষণ এবং প্রতিমার কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বর্তমান প্রতিবেদনে উপলব্ধ না থাকলেও, উৎসুক শহরবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। সনাতনী সংঘের এই অভিনব উদ্যোগ কতটা সফল হয় এবং তা কলকাতার ইতিহাসে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে তিলোত্তমা।
নিরাপত্তা এবং ব্যবস্থাপনার দিক থেকে এই পুজো মণ্ডপটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। শহরের মূল ধমনীতে এমন একটি বড় মাপের উৎসবের আয়োজন ট্রাফিক ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সচেতন। যানজট নিরসনের জন্য আলাদা পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। সব মিলিয়ে, অ্যালেন পার্কের এই দুর্গাপূজা এ বছরের উৎসবের মরসুমে বাঙালির হৃদয়ে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। বাঙালির আবেগ, ভক্তি আর উৎসবের এই নতুন রূপ দেখার অপেক্ষায় গোটা কলকাতা।








