নেপালে বর্তমানে অতিবৃষ্টি এবং ভয়াবহ বন্যার যে চিত্র উঠে আসছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। প্রকৃতির রুদ্রমূর্তির কাছে পর্যটনশিল্প থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জনজীবন—সবই আজ বিপর্যস্ত। এই বিপর্যয়ের ফলে চরম অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নেপালে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকরা। বিশেষ করে কলকাতা থেকে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ৩২ জন পর্যটকের সঙ্গে গত কয়েকদিন ধরে কোনো প্রকার যোগাযোগ করতে না পারায় রাজ্যজুড়ে এক গভীর উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে। নিখোঁজ এই পর্যটকদের পরিবারের সদস্যরা প্রতিটি মুহূর্ত কাটাচ্ছেন চরম উৎকণ্ঠা আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। প্রশাসনের জন্য এই উদ্ধারকার্য এখন কেবল একটি রুটিন কাজ নয়, বরং একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট কলকাতা থেকে তীর্থযাত্রীদের এই দলটি অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। দীর্ঘ যাত্রাপথ অতিক্রম করে গত বুধবার সকালে তারা নেপালের ইমিগ্রেশন অফিসে পৌঁছান। সেই সময় পর্যন্ত তাদের সর্বশেষ অবস্থানের কথা পরিবারের লোকজন জানতে পেরেছিলেন। ইমিগ্রেশন অফিসের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে তারা যখন পরবর্তী গন্তব্যের দিকে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই দুর্যোগের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে। নেপালের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শুরু হয় অবিরাম বৃষ্টিপাত। এই বৃষ্টির জেরে সৃষ্ট হড়পা বান এবং ভয়াবহ ধসের কারণে পার্বত্য এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইমিগ্রেশন পয়েন্ট অতিক্রম করার পর থেকেই এই পর্যটকদের মোবাইল নেটওয়ার্ক অথবা অন্য কোনো যোগাযোগ মাধ্যম আর কাজ করছে না। সংশ্লিষ্ট মহলের নিশ্চিত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন তারা সম্পূর্ণরূপে যোগাযোগহীন অবস্থায় রয়েছেন।
একই সময়ে হুগলি জেলা থেকে যাওয়া আরেকটি পর্যটক দলের খবরও পাওয়া গিয়েছে। তারা নেপালের অন্য একটি এলাকায় আটকে পড়েছেন বলে জানা গেছে। তবে আশার কথা এই যে, হুগলির সেই দলটি আপাতত সুরক্ষিত এবং নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট পর্যটন সংস্থার প্রতিনিধিরা নিরন্তর নজরে রাখছেন। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, ৩২ জনের মূল দলটি ঠিক কোথায় বা কোন অবস্থায় রয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও কোনো পক্ষই নিশ্চিত করতে পারছে না।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে থাকা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি নেপালের ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, উদ্ধারকাজ দ্রুত শুরু করার জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যদিও বৈরী আবহাওয়া, ভারী বৃষ্টিপাত এবং ঘন কুয়াশার কারণে হেলিপ্যাড ব্যবহার করা বা দুর্গম পাহাড়ি পথে উদ্ধারকারী দলের পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এই অনভিপ্রেত ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং উদ্ধারকার্যে সবরকম সহযোগিতার আর্জি জানানো হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের পক্ষ থেকেও এই পর্যটকদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার দাবিতে সরব হওয়া হয়েছে।
নেপালের স্থানীয় বাসিন্দা এবং সেখানকার পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা জলের তীব্র স্রোত এবং একাধিক জায়গায় ধস নামার কারণে উদ্ধারকারী দলগুলি নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছাতে গিয়ে বারবার হিমশিম খাচ্ছে। নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারবর্গ এখন তীর্থের কাকের মতো সরকারি নির্দেশিকা এবং খবরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, আবহাওয়া সামান্য উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ড্রোন এবং দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর বিশেষ দল অতি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে। নিখোঁজ পর্যটকদের পরিচয়পত্র এবং শেষবার ব্যবহৃত মোবাইল টাওয়ার লোকেশন খতিয়ে দেখে তাদের সম্ভাব্য অবস্থানের একটি মানচিত্র তৈরির কাজ চলছে। ঘটনার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য প্রশাসনের তরফে একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে, যেখান থেকে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত তথ্য দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে আগামী কয়েক ঘণ্টায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলেই আশা করছেন দুর্যোগ মোকাবিলা দপ্তরের কর্মকর্তারা। সকলের একটাই প্রার্থনা, এই প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে যেন পর্যটকরা সুস্থ অবস্থায় দ্রুত স্বজনদের কাছে ফিরে আসতে পারেন।







