ক্যাম্পাসে ‘দেশবিরোধী’ কার্যকলাপের তদন্তে এনআইএ দাবি এবিভিপির

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বেশ কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) সরাসরি অভিযোগ তুলেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র চত্বরে সুপরিকল্পিতভাবে ‘দেশবিরোধী’ কার্যকলাপ চালানো হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এবিভিপির রাজ্য নেতৃত্ব অবিলম্বে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ-কে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জোরালো দাবি জানিয়েছে। শনিবার বিকেলে কলকাতার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এবিভিপির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন এবং রাজ্য সরকারের ব্যর্থতার দিকে আঙুল তোলেন।

সংগঠনের অভিযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে কলুষিত করে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করছে। তাদের দাবি, ক্যাম্পাসের অন্দরমহলে নিয়মিতভাবে ভারতবিরোধী স্লোগান দেওয়া হচ্ছে এবং নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ প্রশ্রয় পাচ্ছে। এবিভিপির মতে, এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে গভীর কোনো দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে এই বিষয়টিকে তারা অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যারা দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়।

এবিভিপির অভিযোগের তির সরাসরি রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে। তাদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তৎপর হলেও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কিছু প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির নাম করে ক্যাম্পাসের শান্ত পরিবেশকে বিঘ্নিত করার এই প্রবণতা সম্পর্কে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই এই অরাজকতা বরদাস্ত করা হবে না। সংগঠনের নেতারা আরও দাবি করেন, পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের আমলে রাজ্যজুড়ে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে যে প্রবল রাজনীতিকরণের বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা উপড়ে ফেলার চেষ্টা করলেও তৃণমূল কংগ্রেসের মদতপুষ্ট কিছু লোক এখনো শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা করছে।

এবিভিপির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন এই ধরনের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা জানিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন রাজনৈতিক চাপে সঠিকভাবে তদন্ত করতে পারছে না। সেই কারণেই তারা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হস্তক্ষেপ দাবি করতে বাধ্য হচ্ছে। রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে যখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, সেই সময় এই ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে এবিভিপি। সংগঠনের রাজ্য সম্পাদকের কথায়, যারা ক্যাম্পাসের ভেতরে থেকে দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

এই দাবির প্রেক্ষিতে শিক্ষামহল এবং রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। একদিকে শাসকদল বিজেপি এই অভিযোগকে সমর্থন জানিয়ে দ্রুত তদন্তের দাবি তুলেছে। বিজেপির দাবি, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির নামে দেশবিরোধী কার্যকলাপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর শিকড় উপড়ে ফেলার জন্য কেন্দ্রীয় তদন্ত প্রয়োজন। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তৃণমূলের মুখপাত্রদের দাবি, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই এবিভিপি কেবল কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যবহার করে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার পাঁয়তারা করছে। তাদের মতে, এটি আসলে ছাত্রদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার একটি ঘৃণ্য চক্রান্ত।

এই পরিস্থিতিতে আইনি বিশেষজ্ঞ মহলেও নানা প্রশ্ন উঠছে। এনআইএ কি আদৌ কোনো শিক্ষাঙ্গনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে? রাজ্যের প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া কেন্দ্রীয় সংস্থা কীভাবে তদন্ত শুরু করতে পারে? এসব আইনি জটিলতা নিয়েও শুরু হয়েছে কাটাছেঁড়া। এবিভিপি অবশ্য পিছু হটতে রাজি নয়। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, প্রয়োজনে তারা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দ্বারস্থ হবে এবং এই বিষয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দেবে।

আপাতত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শহর জুড়ে তীব্র আলোচনা চলছে। অভিভাবক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ ছাত্রছাত্রী—সকলেই শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার দাবি জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে কতটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা। শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা রক্ষা এবং পড়ুয়াদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা যে বর্তমান প্রশাসনের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তদন্তের দাবি এবং রাজনীতির দ্বন্দ্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে।