শহরের প্রাণকেন্দ্র এসএসকেএম হাসপাতালের চত্বরে রবিবার দুপুরে এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দুপুরে আচমকাই হাসপাতালের ভেতরে থাকা একটি বিশালাকার গাছের বড় ডাল ভেঙে পড়ে। এই অকাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে এবং গুরুতর জখম হয়েছেন আরও দু’জন। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো হাসপাতাল চত্বরে উপস্থিত রোগী, চিকিৎসাকর্মী ও তাঁদের পরিজনদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জানা গিয়েছে, এদিন দুপুরের দিকে যখন প্রচুর মানুষ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছিলেন বা সেখানে অপেক্ষারত ছিলেন, ঠিক তখনই বিকট শব্দে গাছের একটি বড় অংশ ভেঙে নিচে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ডালটি ভেঙে পড়ার সময় নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিদের সরার মতো নুন্যতম সময় পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। মুহূর্তের মধ্যে ভারী ডালের নিচে চাপা পড়ে যান বেশ কয়েকজন। স্থানীয় সূত্রে খবর, মৃত মহিলা ওই হাসপাতালেরই এক ভর্তি রোগীর আত্মীয় ছিলেন এবং তিনি কোনো কাজে নিচে নেমেছিলেন। ঘটনার পরপরই উপস্থিত লোকজন চিৎকার শুরু করেন। আর্তনাদ শুনে ছুটে আসেন নিরাপত্তা কর্মীরা। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে তড়িঘড়ি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মহিলাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অন্য দু’জন আহত ব্যক্তির চিকিৎসা বর্তমানে জরুরি বিভাগে চলছে এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে। ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন।
এই ঘটনার জেরে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। হাসপাতালের মতো অত্যন্ত জনবহুল এলাকায় পুরনো, জরাজীর্ণ বা বিপজ্জনক গাছগুলি কেন আগেভাগে ছাঁটাই বা অপসারণ করা হয়নি, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ এবং রোগীর পরিজনেরা। গত কয়েকদিন ধরে শহরজুড়ে দফায় দফায় বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়া চলায় গাছগুলোর শিকড় আলগা হয়ে গিয়েছিল বলে পরিবেশবিদদের প্রাথমিক ধারণা। যদিও বনদফতর বা পুরসভার পক্ষ থেকে কেন এই বিষয়ে আগে কোনো সতর্কতা বা নিয়মিত নজরদারি রাখা হয়নি, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও এখন চরম চাপানউতোর শুরু হয়েছে। রাজ্যের শাসকদলের পক্ষ থেকে এই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলের তরফ থেকে এই মৃত্যুকে সরকারি ও প্রশাসনিক চূড়ান্ত ব্যর্থতা হিসেবে দেগে দেওয়া হয়েছে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। দ্রুত আহতদের সুচিকিৎসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে মৃতার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। আপাতত ঘটনাস্থলটি ঘিরে রাখা হয়েছে এবং বিপদজনক গাছগুলি চিহ্নিত করে দ্রুত কাটার কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে পুরসভা। এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর হাসপাতালের স্বাভাবিক জরুরি পরিষেবা বজায় রাখতে সবরকম চেষ্টা করা হচ্ছে। এলাকাটিতে আর কোনো বড় গাছের ডাল বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য বিশেষজ্ঞ দল তলব করা হয়েছে।
শহরবাসীর পক্ষ থেকে জোরালো দাবি তোলা হয়েছে যে, অবিলম্বে রাজ্যের সমস্ত সরকারি হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল চত্বরের জরাজীর্ণ গাছগুলো কেটে ফেলা হোক বা নিয়মিত ছাঁটাই করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মূল্যবান প্রাণ অকালে ঝরে না যায়। ঘটনার সবিস্তার তদন্ত চলছে এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে এই বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে। গাছ কাটার ক্ষেত্রে পুরসভার উদাসীনতা কেন ছিল, তা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে। হাসপাতালের ভেতরে গাছপালা থাকা পরিবেশের জন্য ভালো হলেও, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা যে মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে, এই ঘটনাটি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। পুরো এলাকাটিতে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।








