কলকাতার হোটেল এবং রেস্তোরাঁ শিল্পে বর্তমানে এক গভীর সংকটের মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। ফায়ার লাইসেন্স বা অগ্নিসুরক্ষা ছাড়পত্র নবীকরণ এবং নতুন করে পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার জেরে শহরের বহু হোটেল মালিক এখন চরম দিশেহারা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ব্যবসায়ীদের একাংশ এখন আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে লাইসেন্স না পাওয়ায় অনেক হোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধের উপক্রম হয়েছে, যা সরাসরি কয়েক হাজার মানুষের রুটিরুজিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অগ্নিসুরক্ষা বিভাগের নিয়মকানুন মেনে আবেদন করার পরেও মাসের পর মাস পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ছাড়পত্র। কলকাতার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, সাম্প্রতিককালে লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় যে মন্থর গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অনেক ক্ষেত্রে নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে অগ্নিসুরক্ষার মানদণ্ড কঠোর করা হয়েছে, কিন্তু সেই মানদণ্ড পূরণের পর কেন দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মিলছে না।
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। তবে হোটেল ও আতিথেয়তা শিল্পে এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সরকারের সার্বিক উন্নয়নের বার্তার সাথে কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে সরব হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। তৃণমূলের দাবি, বর্তমান বিজেপি সরকার ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে। প্রাক্তণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় এই ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা এত প্রকট ছিল না বলেই অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। তবে বর্তমান প্রশাসন জানিয়েছে, জননিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
শহরের বড় বড় হোটেলের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি হোটেলগুলোও এই সংকটের কবলে পড়েছে। হোটেল মালিকদের দাবি, একটি হোটেল চালাতে গেলে প্রতিদিন অনেকগুলো আইন ও নিয়ম মেনে চলতে হয়। ফায়ার লাইসেন্স তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। এই ছাড়পত্র না থাকলে বিমা করা থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক লোন পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়তে হয়। অনেক হোটেল মালিক জানিয়েছেন, অগ্নিসুরক্ষা বিভাগের অডিট হওয়ার পরেও চূড়ান্ত অনুমোদন মিলছে না। এই ‘ব্ল্যাঙ্কেট ক্লোজার’ বা ঢালাও বন্ধের আশঙ্কা তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
আইনি বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের পরামর্শ নিয়ে হোটেল মালিকরা এখন কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার কথা ভাবছেন। তাদের মূল দাবি, লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা হোক এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হোক। প্রশাসনিক স্তরে একাধিকবার দরবার করেও সুরাহা না মেলায় শেষমেশ আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই বলেই মনে করছেন হোটেল ব্যবসায়ীরা।
উল্লেখ্য, কলকাতা পর্যটন মানচিত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক আসেন। হোটেল শিল্প সংকটে পড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে পর্যটন শিল্পে। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক জটিলতার মাঝে এই শিল্পটি কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুব শীঘ্রই সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আসে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত এই পদক্ষেপ কতদূর সফল হয়, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। ঘটনার বিস্তারিত সরকারি নির্দেশিকা বা সাম্প্রতিক কোনো বিশেষ নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে, সেই সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র এখনো আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি।








