পুজোর চার সপ্তাহ আগে থেকেই কলকাতা জুড়ে কেনাকাটার ধুম

মহালয়ার প্রহর গুনতে শুরু করেছে তিলোত্তমা কলকাতা। ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকালে বোঝা যাচ্ছে, শারদীয়া উৎসবের দিনক্ষণ আর মাত্র চারটি সপ্তাহ দূরে। মহালয়ার সেই বিশেষ ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের সুর কানে আসার আগেই শহরজুড়ে যে উৎসবের আমেজ, তা এখন আর কেবল ক্যালেন্ডারে সীমাবদ্ধ নেই। বরং কলকাতার রাজপথ, অলিগলি, শপিং মল এবং বিপণীকেন্দ্রগুলো জানান দিচ্ছে, বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের প্রস্তুতি দোরগোড়ায়। নিউ মার্কেট থেকে শুরু করে গড়িয়াহাট, হাতিবাগান কিংবা এসপ্ল্যানেড—শহরের প্রতিটি শপিং হাব এখন ক্রেতাদের আনাগোনায় সরগরম। পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে গৃহসজ্জার সরঞ্জাম, প্রতিটি দোকানেই ভিড় উপচে পড়ছে।

গত কয়েক বছরে ডিজিটাল লেনদেন এবং অনলাইন কেনাকাটার রমরমা থাকলেও, এবারের পুজোয় চিত্রটা খানিকটা ভিন্ন। সশরীরে দোকানে গিয়ে পোশাক ছুঁয়ে দেখা, যাচাই করে নেওয়া এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানোর চিরাচরিত ঐতিহ্যে ফিরছেন মানুষ। বিশেষ করে সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে শপিং মলগুলোতে যে জনস্রোত আছড়ে পড়ছে, তা সামলাতে নিরাপত্তা কর্মীদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই শেষ চারটি সপ্তাহ হলো বিক্রির প্রকৃত স্বর্ণকাল। তাই ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে প্রতিটি ব্র্যান্ড এখন নানা ধরনের ডিসকাউন্ট এবং আকর্ষণীয় অফারের পসরা সাজিয়ে বসেছে। কেনাকাটার এই ঢল দেখে ব্যবসায়ীদের মুখে চওড়া হাসি ফুটছে।

রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকেও উৎসবের নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শহরজুড়ে পুলিশের টহলদারি বাড়ানো হয়েছে এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক উদাসীনতার অভিযোগ তোলা হলেও, রাজ্য সরকারের দাবি, উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজ্যের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের আনন্দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, গত কয়েক বছরে উৎসবের যে জাঁকজমক দেখা গিয়েছিল, তাকে ছাপিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই এবারের সব প্রস্তুতি চলছে। রাজ্যের বর্তমান শাসক দল বিজেপিও জানিয়েছে, উৎসবের মরশুমে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। উৎসবের দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে পুলিশের পাশাপাশি নাগরিক স্বেচ্ছাসেবকদেরও রাস্তায় নামানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গড়িয়াহাট বা হাতিবাগানের মতো ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোর ফুটপাতে হকারদের কাছেও এখন সাজ সাজ রব। নিত্যনতুন ফ্যাশন আর রংবেরঙের পোশাকে সেজে উঠেছে দোকানপাট। সাধারণ ক্রেতাদের কথায়, পুজোর ঠিক আগের মুহূর্তের তীব্র ভিড় এড়াতে তারা কিছুটা আগেভাগেই কেনাকাটা সেরে রাখতে চাইছেন। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার মাসের শুরুতেই পুজোর বাজেটের একটি বড় অংশ আলাদা করে রেখেছিলেন পছন্দের জামাকাপড় কেনার জন্য। শপিং মলগুলোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিবারের সাথে কেনাকাটা করা আর একসাথে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে গোটা শহরে।

শুধুমাত্র পোশাকই নয়, জুতো, গয়না এবং প্রসাধন সামগ্রীর দোকানেও উপচে পড়া ভিড় লক্ষণীয়। শহরতলির মানুষজনও শনি ও রবিবার ছুটির দিনে দল বেঁধে শহরে আসছেন কেনাকাটার টানে। মেট্রো রেল এবং বাস পরিষেবায় যাত্রীদের বাড়তি ভিড় সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। পুজোর ঠিক আগের এই ব্যস্ততা প্রমাণ করছে, উৎসবের আনন্দে কোনো খামতি রাখতে নারাজ বাঙালি। স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, এবার বিক্রির পরিমাণ গত বছরের সমস্ত রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাবে।

উৎসবের এই সময়ে কলকাতার ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে, যাতে কেনাকাটার ভিড়ে যানজট জনজীবনকে বিপর্যস্ত না করে। পুজোর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেনাকাটার উত্তাপ এখন তুঙ্গে। শহর থেকে শহরতলি, সর্বত্র এখন একই সুর—বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পার্বণ ‘দুর্গাপুজো’কে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত মহানগরী। সব মিলিয়ে, পুজোর আগে কলকাতার ব্যস্ততা কেবল কেনাকাটারই নয়, বরং বাঙালির আবেগ এবং ঐতিহ্যের মিলনমেলার সাক্ষী হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার কড়াকড়ি, প্রশাসনের নজরদারি এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এবারের পুজোয় এক বিশেষ চমক অপেক্ষা করছে তিলোত্তমার জন্য।