বক্সায় বাঘ ফেরানোর তোড়জোড়, বন্যপ্রাণ রক্ষায় বিশেষ টিকাকরণ অভিযান

উত্তরবঙ্গের বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পকে ফের বাঘের আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তোড়জোড় শুরু হয়েছে জোরকদমে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অরণ্যের পরিবেশে ফের রাজকীয় বেঙ্গল টাইগারের পদচারণা নিশ্চিত করতে বন দফতর একাধিক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান অঙ্গ হিসেবে প্রকল্প এলাকার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে পোষ্য কুকুরদের জন্য বিশেষ টিকাকরণ অভিযান শুরু করা হয়েছে। বন আধিকারিকদের মতে, পোষা প্রাণীদের মাধ্যমে যাতে কোনোভাবেই সংক্রামক রোগ বন্যপ্রাণীদের শরীরে না পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের বনাঞ্চল রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সেই নির্দেশ মেনেই বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের সুরক্ষাবলয় আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। বর্তমানে বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমল থেকে যেসব পরিকাঠামোগত ফাঁকফোকর ছিল, তা দ্রুত মেরামত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের বর্তমান নীতি অনুযায়ী, বাঘের পুনরুত্থান প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা বন দপ্তরের প্রধান অগ্রাধিকার।

বন দপ্তর সূত্রে খবর, বক্সার বাফার জোনে থাকা গ্রামগুলিতে প্রচুর সংখ্যক কুকুর রয়েছে। এই কুকুরদের মাধ্যমে ক্যানাইন ডিস্টেম্পার বা র‍্যাবিসের মতো প্রাণঘাতী ভাইরাস বাঘের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। অতীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অভয়ারণ্যে বাঘের মৃত্যুর কারণ হিসেবে এই ধরণের সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে। তাই নতুন করে বাঘ ছাড়া বা বাঘের আনাগোনা বাড়ার আগেই এই ঝুঁকি দূর করতে চাইছে কর্তৃপক্ষ। উত্তরবঙ্গের প্রতিটি বনাঞ্চল সংলগ্ন জনবসতিতে এই সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।

জানা গিয়েছে, রাজ্যের শাসক দল বিজেপি সরকার এই প্রকল্পকে রাজ্যের পর্যটন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম মাইলফলক হিসেবে দেখছে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক নির্দেশে বনদপ্তর এখন গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির সাথে যৌথভাবে কাজ করছে। টিকাকরণের পাশাপাশি গৃহপালিত পশুদের গতিবিধির উপরেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই যাতে বনাঞ্চলের মূল এলাকায় পোষ্যরা প্রবেশ করতে না পারে, তার জন্য কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে বনকর্মীদের মাধ্যমে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা চেয়ে বনদপ্তরের পক্ষ থেকে একাধিক প্রচার কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। গ্রামের মানুষকে বোঝানো হচ্ছে কেন বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা জরুরি এবং কেন পোষ্যদের টিকাকরণ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি কুকুরকে চিহ্নিত করে তাদের স্বাস্থ্যের ডিজিটাল রেকর্ডও রাখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। বাঘ ফেরানোর সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনায় এই ক্ষুদ্র পদক্ষেপগুলি দীর্ঘমেয়াদে বড় সাফল্য বয়ে আনবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বন আধিকারিকরা।

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বর্তমান সরকার যে বদ্ধপরিকর, তার প্রমাণ এই ধরণের সুপরিকল্পিত কাজ। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি এখানকার জৈব বৈচিত্র্য রক্ষা করাও লক্ষ্য। আগামী দিনে বক্সার গহীনে বাঘের গর্জন ফেরানোর লক্ষ্যে এই টিকাকরণ অভিযানকে একটি অত্যাবশ্যকীয় ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এই কর্মসূচি আপাতত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে যতক্ষণ না পর্যন্ত সমস্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাকরণ সম্পন্ন হয়।

উল্লেখ্য, বাঘের পুনরুত্থানের জন্য বক্সার ভৌগোলিক অবস্থা এবং শিকারের পর্যাপ্ত জোগান নিয়েও সমীক্ষা চালাচ্ছে বনদপ্তর। শিকারি প্রাণীদের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল অক্ষুণ্ণ রাখতে তৃণভোজী প্রাণীদের সংখ্যা বৃদ্ধির দিকেও নজর রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে, বাঘের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা বক্সায় এখন সাজ সাজ রব। সরকার এই প্রকল্পকে সফল করতে কোনো ধরণের খামতি রাখতে নারাজ।