পশ্চিমবঙ্গ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের শিল্প-খরা কাটিয়ে রাজ্যের বুকে শিল্পায়নের এক নতুন জোয়ার আনার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। এই প্রেক্ষাপটে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শুক্রবারের একটি বিশেষ ঘোষণা রাজ্য রাজনীতি ও শিল্প মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি এবং রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কর্ণধার মুকেশ আম্বানি এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র অনন্ত আম্বানি খুব শীঘ্রই পশ্চিমবঙ্গ সফরে আসছেন। শিল্প মানচিত্রের নিরিখে এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের গতি প্রকৃতি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে নানা মহলে সংশয় ছিল। বিশেষত বিগত সরকারের জমানায় শিল্পায়নের গতি অত্যন্ত মন্থর ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। কিন্তু বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতি ও বিনিয়োগের আবহে এক ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং রাজ্যের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাঁর এই কর্মমুখী উদ্যোগের ফলেই আজ দেশি ও বিদেশি শিল্পপতিদের নজরে পশ্চিমবঙ্গ এক সম্ভাবনাময় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। আম্বানি পরিবারের এই সফর সেই প্রচেষ্টারই এক বাস্তব রূপায়ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, মুকেশ আম্বানি এবং অনন্ত আম্বানির এই সফরকে সফল করে তুলতে রাজ্য সরকার এক বিশেষ প্রস্তুতির পরিকল্পনা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি তদারকি করছেন। রাজ্যের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল, যেমন— খড়গপুর, হলদিয়া এবং আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল ছাড়াও নবনির্মিত শিল্প পার্কগুলো আম্বানিদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, পেট্রোকেমিক্যাল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে রাজ্যের রিনিউয়েবল এনার্জি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি যেভাবে শিল্পপতিদের আকৃষ্ট করছে, তা এই সফরের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী দল হিসেবে এই ঘটনাপ্রবাহকে কীভাবে গ্রহণ করে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল রয়েছে। তবে বর্তমান বিজেপি সরকারের দাবি, রাজ্যের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য। আম্বানিদের মতো বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা যখন রাজ্যে আসছেন, তখন নিঃসন্দেহে তা রাজ্যের শিল্পোন্নয়নের প্রতি তাঁদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত আশাবাদী যে, এই সফরের ফলশ্রুতিতে রাজ্যের সাধারণ মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের প্রচুর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্প সম্মেলন এবং বৈঠকের পর থেকেই রাজ্যের শিল্প পরিবেশ নিয়ে দেশ জুড়ে একটি ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও আম্বানি পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও সফরের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবুও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিবৃতি রাজ্যবাসীর মনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। রাজ্যের শিল্পোন্নয়নের জন্য এই বৈঠক একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
সফরের মূল উদ্দেশ্য এবং বিনিয়োগের পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে না এলেও, প্রশাসনিক সূত্রে খবর মিলেছে যে সফরসূচি চূড়ান্ত হওয়ার পর রাজ্য সরকারের তরফে বিস্তারিত জানানো হবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই সফরে বড় কোনো প্রকল্পের শিলান্যাস বা বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেন কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের শিল্পমহল। রাজ্যের শিল্পায়নের পথে যে প্রতিবন্ধকতা ছিল, তা যে বর্তমানে অনেকটাই অপসারিত হয়েছে, তা এই সফর থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
এই সফরকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে, মুকেশ আম্বানি ও অনন্ত আম্বানির সফরকে কেন্দ্র করে রাজ্য প্রশাসন পুরোপুরি প্রস্তুত। রাজ্যের বর্তমান শিল্প-বান্ধব নীতি যে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে, তা এই সফর থেকেই পরিষ্কার। অতীতে যে শিল্প-খরা দেখা গিয়েছিল, তা কাটিয়ে নতুন করে শিল্পায়নের সূর্যোদয় হচ্ছে বলেই দাবি করছে বর্তমান সরকার। আগামী দিনে এই সফর থেকে কী কী প্রাপ্তি হয়, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন। তবে আম্বানিদের মতো বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর বাংলায় আগ্রহ দেখানো নিঃসন্দেহে রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য একটি বড় শুভ লক্ষণ হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। এই সফর পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ পথচলাকে আরও সুদৃঢ় করবে বলেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।








