গণেশ পুজোয় ব্রাত্য মমতা, আমন্ত্রণ পেলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

কলকাতার উৎসবমুখর জীবনে দুর্গাপূজার মহিমা সর্বজনবিদিত, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ‘গণেশ চতুর্থী’ উৎসবের জাঁকজমকও শহরবাসীর নজর কাড়ছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রীয় ঐতিহ্যের আদলে আয়োজিত গণেশ উৎসব এখন কলকাতার সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। তবে এই বছরের গণেশ চতুর্থীকে কেন্দ্র করে কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং প্রবল রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনা দানা বেঁধেছে। ‘মহারাষ্ট্র নিবাস’-এর গণেশ উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে যে অভাবনীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে, তা এখন শহরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট প্রথা চলে আসছিল। প্রতিবারই এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনে আমন্ত্রণ জানানো হতো রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এটি ছিল যেন এক অলিখিত রীতি। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে এই বছরের ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘদিনের এই চিরাচরিত প্রথা ভেঙে মহারাষ্ট্র নিবাস কর্তৃপক্ষ এবার আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্বোধক হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়নি। পরিবর্তে, তারা রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে এই অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এই ঘটনাটি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক বড়সড় পরিবর্তনের বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেবল মুখ্যমন্ত্রী নন, সূত্রের খবর অনুযায়ী, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজ্যের রাজ্যপালকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক প্রধান এবং প্রশাসনিক প্রধানের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আয়োজক কমিটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। রাজ্যের বর্তমান শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এই আমন্ত্রণের পরিবর্তনকে নিতান্তই একটি প্রশাসনিক ও সৌজন্যমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। তাদের মতে, বর্তমান সরকারের প্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার দেওয়াটাই নিয়ম। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এখনও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে দলের অন্দরে যে এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই আমন্ত্রণের রদবদল কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিষয় নয়। রাজ্যের ক্ষমতার অলিন্দে যে ব্যাপক পটপরিবর্তন হয়েছে, এটি তারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ সময় ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন, রাজ্যের শাসনভার শুভেন্দু অধিকারীর হাতে আসার পর থেকেই সেই ভারসাম্যে আমূল বদল এসেছে। সরকারি এবং আধাসরকারি অনুষ্ঠানগুলোতে আমন্ত্রিতদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে এখন এক নতুন ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে বর্তমান প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারের প্রতিফলন ঘটছে।

মহারাষ্ট্র নিবাসের এই সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, তা নিয়ে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে মুখ খোলা না হলেও, বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বর্তমান প্রশাসনিক প্রধানকে সম্মান জানানোই আয়োজকদের মূল লক্ষ্য। রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রীর যুগপৎ উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির মর্যাদা ও গুরুত্ব অনেক গুণ বাড়িয়ে তুলবে বলে কমিটির সদস্যরা মনে করছেন। কলকাতার বুকে আয়োজিত এই ধরনের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি সবসময়ই আলোচনার খোরাক জোগায়, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ, এই আমন্ত্রণপত্র বিলির ঘটনাটি রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সরাসরি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এই অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত সূচি প্রকাশিত হবে বলে জানা গিয়েছে। অনুষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার কড়াকড়ি এবং অন্যান্য প্রস্তুতির কাজও জোরকদমে চলছে। শহরের মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য, যেখানে রাজ্যের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার এক দৃশ্যমান রূপ ফুটে উঠবে। যদিও অনুষ্ঠান সংক্রান্ত বিশদ নথিপত্র বা পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও এই রদবদল যে রাজ্যের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। দুর্গাপূজার আগে কলকাতার রাজপথে রাজনৈতিক উত্তাপ যে এই গণেশ উৎসবকে ঘিরেই কয়েক ধাপ বেড়ে গেল, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, বিরোধী দল এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় কী কৌশল গ্রহণ করে এবং আগামী দিনে রাজ্যের অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতেও একই ধরণের রাজনৈতিক প্রভাব পড়ে কি না। সব মিলিয়ে, কলকাতার গণেশ চতুর্থী এই বছর কেবল গণপতির আরাধনার নয়, বরং ক্ষমতার অলিন্দের রদবদলের এক নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।