যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তের দায়িত্বে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

কলকাতা তথা রাজ্যের শিক্ষা মহলে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর অবশেষে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে এই বিষয় নিয়ে যে জোরালো দাবি উঠেছিল, তা মেনে নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই পথে হেঁটেছে। বিশেষ করে ডানপন্থী সংগঠনগুলোর তরফ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরের বেশ কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছিল। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনের জমানায় শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন তৎপর বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

উল্লেখ্য যে, অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার রেশ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। বর্তমানে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যদিও এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিরোধী শিবিরের মতে, এভাবে বাইরের কাউকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী। তবে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, ক্যাম্পাসে আইন-শৃঙ্খলা এবং নৈতিক পরিবেশ রক্ষা করা তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে খবর, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে। বিশেষ করে পড়ুয়াদের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বাইরের ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত প্রবেশাধিকার রুখতে যে অভিযোগগুলি উঠেছিল, তার সবটাই খতিয়ে দেখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন, রাজ্যপালের নির্দেশে এবং বর্তমান সরকারের পরামর্শ মেনেই এই স্বচ্ছতার পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী এবং শিক্ষক মহলের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তাতে নিরপেক্ষ তদন্তের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে যে আপসহীন, তা এই পদক্ষেপে স্পষ্ট। যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্ররা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তারা এই তদন্ত প্রক্রিয়ার উপর নজর রাখছেন এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশ্রয় নিলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যাবেন।

তদন্তকারী বিচারপতি কবে থেকে কাজ শুরু করবেন এবং কতদিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেবেন, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে পাওয়া যায়নি। তবে মনে করা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তদন্তের রূপরেখা চুড়ান্ত করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছেন কর্তৃপক্ষ। পুলিশি প্রহরা বাড়ানো হয়েছে এবং ক্যাম্পাসে পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। রাজ্য সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উভয়েই জানিয়েছে যে, পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখাই এখন তাদের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই তদন্ত কেবল একটি ঘটনার নিষ্পত্তি করবে না, বরং আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেও সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক কালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন কারণে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে, যা কাম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে এই ধরণের বিচারবিভাগীয় তদন্ত মাইলফলক হতে পারে। রাজ্য সরকারের এই কঠোর অবস্থানে খুশি অভিভাবক মহলও। তারা মনে করছেন, দ্রুত রিপোর্ট প্রকাশ করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ক্যাম্পাসে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরবে। তবে সমস্ত রাজনৈতিক বিতর্ক সরিয়ে রেখে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরের প্রশাসনিক জটিলতা এবং আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও এই তদন্তকারী দল অনুসন্ধান করতে পারে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো নির্দেশিকা এখনও আসেনি। বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে রাজ্য শিক্ষা দফতর।