কলকাতা পুরসভার অন্দরে এখন চরম অস্থিরতা। একজন সহকর্মীকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে এবার বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি দিলেন কলকাতা পুরসভার ইঞ্জিনিয়াররা। তাঁদের অভিযোগ, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই যেভাবে তড়িঘড়ি এই গ্রেফতারি সম্পন্ন হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই ঘটনার প্রতিবাদে আজ থেকে কর্মবিরতির ডাক দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা। ইঞ্জিনিয়ারদের এই সংগঠনের দাবি, অবিলম্বে তাদের সহকর্মীকে মুক্তি না দিলে শহরের জরুরি পরিষেবা ও উন্নয়নমূলক কাজ সম্পূর্ণভাবে থমকে যাবে।
কলকাতা পুরসভার সদর দফতরে আজ সকাল থেকেই উত্তজনা ছিল তুঙ্গে। ইঞ্জিনিয়ারদের সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রশাসনের এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ সরাসরি সরকারি আধিকারিকদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। তাদের দাবি, কোনো প্রজেক্টে গাফিলতি বা প্রশাসনিক ত্রুটি থাকলে তার আইনি প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও যেভাবে পুলিশি হেনস্থা ও গ্রেফতারের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, তা অভূতপূর্ব। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরসভার শীর্ষ আধিকারিকরা বৈঠক করলেও, তাতে কোনো সমাধান সূত্র মেলেনি। ইঞ্জিনিয়ারদের সাফ কথা, যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের দাবি পূরণ হচ্ছে, ততক্ষণ তারা কাজকর্মে ফিরবেন না।
উল্লেখ্য, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজ্যের শাসক দল বিজেপি এবং বিরোধী দল তৃণমূলের মধ্যে যখন চাপানউতোর তুঙ্গে, তখন পুরসভার এই অভ্যন্তরীণ সংকট নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় পুর পরিষেবার যে পরিকাঠামো ছিল, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আমলে তাতে আমূল বদল আনার প্রক্রিয়া চলছে। তবে এই রদবদলের আবহে ইঞ্জিনিয়ারদের এই কর্মবিরতির ডাক সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন পরিষেবা ব্যাহত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গিয়েছে, ধৃত ইঞ্জিনিয়ারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আর্থিক অনিয়ম বা গাফিলতির অভিযোগ আনা হয়েছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। বিস্তারিত তথ্যের অভাবে এই মুহূর্তে গ্রেফতারির সঠিক কারণ স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হয়নি। পুলিশ ও পুর কর্তৃপক্ষের মধ্যে এই নিয়ে তথ্যের আদান-প্রদান চললেও, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই।
পুরসভার বিভিন্ন দফতরের ইঞ্জিনিয়ারদের অভিযোগ, কোনো ছোটখাটো প্রশাসনিক বিচ্যুতিকে বড় করে দেখিয়ে রাজনৈতিকভাবে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই গ্রেফতারির ঘটনা সেই কৌশলেরই অংশ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা। যদি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে শহরের জল সরবরাহ, আবর্জনা অপসারণ এবং বেআইনি নির্মাণ রোখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিরোধী দল তৃণমূল ইতিমধ্যেই এই ইস্যুটিকে হাতিয়ার করে বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে। তাদের মতে, বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি আধিকারিকরা কেউই নিরাপদ নন। অন্যদিকে, রাজ্য বিজেপির পক্ষ থেকে বিষয়টিকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দাবি বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
তবে সাধারণ নাগরিকরা এই রাজনীতির লড়াইয়ে নিজেদের পরিষেবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থা ও রাস্তাঘাট রক্ষণাবেক্ষণের মতো জরুরি ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারদের এই কর্মবিরতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে মহানগরীর দুর্ভোগ চরমে উঠবে। আপাতত পুরো পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন পুর কমিশনার ও মেয়র। আলোচনার মাধ্যমে জট কাটানোর চেষ্টা চলছে বলে সরকারি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, তবে ইঞ্জিনিয়ারদের অনড় মনোভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
বর্তমানে পুরসভার অন্দরে কাজের পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এই ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ্যে চলে এল। সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মতে, প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনই সরকারি কর্মচারীদের কাজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।








