WB – ইডির চুরির অভিযোগ খারিজ মমতার, সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী

#image_title

কোলকাতা, ভারত: এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর পক্ষ থেকে আনা চুরির অভিযোগ সরাসরি নস্যাৎ করে দিয়ে দেশের শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা জমা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আইপ্যাক (I-PAC) অফিসে ইডির তল্লাশি অভিযানের সময় মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি এবং সেখান থেকে নথি নিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কে এবার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন তিনি। হলফনামায় মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, সেই মুহূর্তে তাঁর উপস্থিতি ছিল যেমন আইনানুগ, তেমনই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য।

গত কয়েক মাস ধরেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির সঙ্গে রাজ্য সরকারের টানাপোড়েন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এরই প্রেক্ষিতে আইপ্যাক অফিসে তল্লাশি চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ইডির দাবি ছিল, তদন্তের কাজে ব্যবহৃত বা বাজেয়াপ্ত করার যোগ্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি মুখ্যমন্ত্রী জোরপূর্বক সরিয়ে নিয়েছেন, যা চুরির শামিল। তবে হলফনামায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, সেখান থেকে শুধুমাত্র তাঁর দলের অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু রাজনৈতিক নথি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তা করা হয়েছে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই।

মুখ্যমন্ত্রীর আইনি উপদেষ্টাদের মতে, এই নথিগুলি কোনোভাবেই ইডির তদন্তের বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। এগুলি নিখাদ রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি বা দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় সংক্রান্ত কাগজ ছিল। হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সংস্থা যখন তল্লাশি চালায়, তখন তারা অনেক সময়ই এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে এমন কিছু সামগ্রী বা নথি হস্তগত করতে চায় যা তদন্তের পরিসরের মধ্যে পড়ে না। এই ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতেই মুখ্যমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং দলের গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে একটি শক্ত অবস্থান নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন যে, ইডি কোন প্রমাণের ভিত্তিতে রাজ্যের একজন সাংবিধানিক প্রধানের বিরুদ্ধে এই ধরণের অভিযোগ আনল। ইডির এই ধরণের কার্যকলাপ যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর পরিপন্থী বলেও মনে করছে নবান্ন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্তে সহযোগিতা করা মানে এই নয় যে এজেন্সি যা ইচ্ছা তাই করবে। মুখ্যমন্ত্রীর সেখানে যাওয়া কোনোভাবেই তদন্তে বাধা সৃষ্টি করা ছিল না, বরং তা ছিল পরিস্থিতির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি প্রচেষ্টা।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বেঞ্চে এই হলফনামা জমা পড়ার পর বিষয়টি এক নতুন মোড় নিয়েছে। এর আগে ইডি আদালতে দাবি করেছিল যে, মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারণে তাদের অফিসাররা কাজ করতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা দাবি, তিনি শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই সেখানে গিয়েছিলেন এবং কোনো আধিকারিককে হেনস্থা বা ভয় দেখানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বরং এজেন্সিই অতি-সক্রিয়তা দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই আইনি লড়াই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে তৃণমূল নেতৃত্বকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই হলফনামা সেই প্রতিবাদেরই এক আইনি প্রতিফলন। রাজ্য রাজনীতিতে বিরোধীরা অবশ্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। বিজেপি এবং সিপিআইএম নেতৃত্ব মনে করছেন, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেন, তবে সাধারণ মানুষের কাছে কী বার্তা যাবে? যদিও তৃণমূল শিবির এই যুক্তি মানতে নারাজ।

শীর্ষ আদালতে এই মামলার শুনানি চলাকালীন আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পর মামলাটি আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরবর্তী শুনানিতে ইডি মুখ্যমন্ত্রীর এই হলফনামার প্রেক্ষিতে কী পালটা যুক্তি দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল। একই সঙ্গে আদালত কি তদন্তকারী সংস্থার কাজে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপকে স্বীকৃতি দেবে, নাকি মুখ্যমন্ত্রীর রক্ষাকবচের দাবিকে মান্যতা দেবে—তা নিয়ে আইনি মহলে জল্পনা তুঙ্গে।

হলফনামার মূল বিষয়বস্তুতে বারবার ‘সংবেদনশীল রাজনৈতিক নথি’ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব কৌশল ও তথ্যের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই তথ্য যদি কোনো অছিলায় তদন্তকারী সংস্থার হাতে চলে যায়, তবে তা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অসম সুবিধা তৈরি করতে পারে। এই যুক্তি দিয়ে তিনি নিজের উপস্থিতিকে সমর্থন করেছেন। পাশাপাশি ইডির আধিকারিকদের ব্যবহার এবং তদন্তের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সামগ্রিকভাবে, সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া এই হলফনামা কেবল একটি আইনি জবাব নয়, বরং এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বয়ান। এর মাধ্যমে তিনি যেমন ইডির অভিযোগের মোকাবিলা করছেন, তেমনই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইকেও এক নতুন ভিত্তি দিচ্ছেন। এখন দেখার বিষয়, আইনি লড়াইয়ের এই ময়দানে চূড়ান্ত জয় কার হয় এবং সুপ্রিম কোর্ট এই সংঘাতের কোনো স্থায়ী সমাধান সূত্র বাতলে দেয় কি না। কেন্দ্রীয় সংস্থা বনাম রাজ্য সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী দ্বৈরথে এই হলফনামা নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।