গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লির সদর দপ্তরে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সূত্রের খবর, বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) বিএল সন্তোষ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীশীথ প্রামাণিকও। মূল আলোচ্য বিষয় ছিল পশ্চিমবঙ্গে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং কীভাবে দ্রুত তা কাটিয়ে ওঠা যায়, সেই দিকনির্দেশনা। বিশেষত, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে বিপুল সংখ্যক সংঘর্ষ ও সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠেছিল, সেই পরিপ্রেক্ষিতে দলের কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং বুথ স্তরের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
প্রবীণ বিজেপি নেতারা মনে করছেন, আপাত দৃষ্টিতে রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যে যে ধরনের সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে, তা ভোটের আগে উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তাই নাড্ডার এই বৈঠক ছিল মূলত ঐক্য স্থাপন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা পুনর্বহাল করার একটি প্রচেষ্টা। রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে যেন কোনো প্রকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে না আসে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কাজ সম্পন্ন করতে হবে, তার একটি বিস্তারিত রোডম্যাপও এই বৈঠকে পেশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পগুলির সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা এবং রাজ্যে দলীয় কর্মীদের ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলির যথাযথ আইনি প্রতিকার চেয়ে উচ্চতর আদালতে আবেদন করার কৌশল নির্ধারণ।
রাজ্যসভার সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত, যিনি দলের কেন্দ্রীয় স্তরের কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তিনি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং ভোটারদের মনোভাব নিয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় দলীয় কর্মীরা এখনও ভীতিমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারছেন না। এর জবাবে, নাড্ডা নির্দেশ দেন যে স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী ‘সুরক্ষা চক্র’ তৈরি করতে হবে, যেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন। শুধু তাই নয়, দলীয় নেতাদের ওপর হামলার ঘটনায় রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলার কৌশল স্থির হয়েছে।
বৈঠকে উঠে আসা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ ছিল ‘পকেট কমিটি’ গঠন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক জায়গায় স্থানীয় নেতৃত্ব নিজেদের ঘনিষ্ঠদের নিয়ে কমিটি তৈরি করেছে, যা দলের বৃহত্তর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করছে। নাড্ডা এই ধরনের প্রবণতা কঠোরভাবে দমন করার নির্দেশ দেন এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে কমিটি পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন, শুধুমাত্র অনুগত ব্যক্তিরা নয়, যাদের তৃণমূলের মোকাবিলা করার ক্ষমতা আছে, তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতে হবে। আগামী দিনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আরও ঘন ঘন রাজ্যে আসবেন বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সফরের সময়সূচি নিয়েও প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। এই সফরগুলির মাধ্যমে রাজ্য স্তরের নেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হবে যাতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়।
বিজেপি নেতৃত্বের মতে, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমশ অসন্তুষ্ট, বিশেষত নিয়োগ দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে রাখার অভিযোগে। এই অসন্তোষকে ভোট বাক্সে রূপান্তরিত করতে গেলে, স্থানীয় পর্যায়ে দুর্বলতা কাটানো জরুরি। এই বৈঠক সেই উদ্দেশ্যেই ছিল—শুধুমাত্র উপরমহলের কৌশল নির্ধারণ নয়, বরং তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে সংগঠিত করার বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে বের করা। রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব এই বৈঠক থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করেছে বলে মনে করা হচ্ছে, যা আগামী দিনগুলিতে রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানে স্পষ্ট প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে, যেভাবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরাসরি সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সমাধানের ভার রাজ্য সভাপতিকে দিয়েছেন, তা দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। এই কৌশলগত আলোচনা নিঃসন্দেহে আগামী লোকসভা নির্বাচনকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তুলবে।







