ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় খামেনির মৃত্যু, ৪০ দিনের শোক ঘোষণা

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক অভাবনীয় মোড় নিয়ে আসা এই ঘটনায় তেহরানসহ ইরানের প্রধান শহরগুলোতে শোক ও উত্তেজনার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে এই হামলাকে ইরানি জনগণের জন্য তাদের দেশ পুনরুদ্ধারের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ’ বলে অভিহিত করেছেন। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রাণ হারান। এই সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ইরানের রাজপথে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান। কেউ শোকাতুর হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন, আবার কেউ পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। ইরানি সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এক জরুরি বৈঠক আহ্বান করে এবং দেশজুড়ে ৪০ দিনের শোক পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। তেহরানের সরকারি গণমাধ্যম জানিয়েছে যে, এই হামলাটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান। ইসরায়েল দাবি করেছে যে ইরানের ক্রমাগত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরির প্রচেষ্টার জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যে রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, এটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং ইরানের সাধারণ মানুষের জন্য একটি নতুন ভোরের সূচনা। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে ট্রাম্প উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাধারণ নাগরিকদের পাশে আছে এবং তারা যেন এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খামেনির মৃত্যুতে ইরানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হতে পারে এবং এতে করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি (IRGC) ইতিমধ্যে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, ‘শহীদ খামেনির রক্ত বৃথা যাবে না এবং এর যোগ্য জবাব যথাসময়ে দেওয়া হবে।’ এদিকে আন্তর্জাতিক মহলে এই হামলার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাশিয়া ও চীন এই পদক্ষেপের কঠোর নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে যাতে পরিস্থিতি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে মোড় না নেয়। তেহরানের প্রধান মসজিদগুলোতে দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। হাজার হাজার কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি ভবনগুলোতে। দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত থমথমে। ইন্টারনেট সংযোগ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। খামেনির উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়েও পর্দার আড়ালে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস এখন নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবে। বর্তমান কঠিন সময়ে ইরানের সাধারণ মানুষ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। একদল মানুষ যেমন পরিবর্তনের আশা করছেন, অন্যদল তেমনি তাদের নেতার মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ এবং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। যুদ্ধের এই দামামা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। সামনের দিনগুলোতে ইসরায়েল ও আমেরিকার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয় এবং ইরান কীভাবে এর পাল্টা জবাব দেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব। এটি নিছক একটি নেতার মৃত্যু নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।