ইরানি সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মৃত্যু এবং পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা

ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক যৌথ সামরিক অভিযানে নিহত হয়েছেন। এই আকস্মিক ও অভূতপূর্ব হামলাটি ইরানি শাসনব্যবস্থার মূলে চরম আঘাত হেনেছে। হামলার পরপরই তেহরানসহ ইরানের প্রধান শহরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতিতে খামেনির ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। তার মৃত্যুর সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যেমন শাসকগোষ্ঠীর সমর্থকরা শোকে মুহ্যমান, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্ন এক চিত্র উঠে এসেছে। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, জনৈক নারী খামেনির জ্বলন্ত ছবিতে সিগারেট জ্বালিয়ে উৎসব পালন করছেন, যা ইরানিদের একাংশের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের ওপর কড়া নজর রাখছিল। শনিবারের এই আক্রমণটি সেই ধারাবাহিক উত্তেজনারই এক চরম পরিণতি বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। পেন্টাগন এবং আইডিএফ-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এই হামলাটি পরিচালনা করা হয়েছে যা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে। তবে এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। খামেনির শাসনামলে ইরান লেবানন, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের মতো দেশগুলোতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। এখন তার অনুপস্থিতিতে এই ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ারগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের পরবর্তী উত্তরাধিকার কে হবেন তা নিয়েও শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনা। দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস জরুরি বৈঠকে বসেছে। খামেনির মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং এটি ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণের এক সন্ধিক্ষণ। এর আগে গত কয়েক বছরে ইরানে মাহসা আমিনি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যে হিজাব বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা খামেনির ক্ষমতাকে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আন্দোলনকারী গোষ্ঠীগুলো পুনরায় সংগঠিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্র দেশগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং একে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরান এখন সরাসরি কোনো পাল্টা আক্রমণের পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাজার এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও এক ধরণের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তেহরানের রাস্তাঘাটে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে একদিকে চলছে শোক মিছিল আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তার আতঙ্ক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মৃত্যু পরবর্তী ইরান হবে আগের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা হয়তো সমগ্র বিশ্বের মানচিত্রকেই প্রভাবিত করতে পারে। এই ঘটনায় স্পষ্ট যে, ইরান এবং পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ এক নতুন এবং বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে।