পঞ্চায়েত প্রধানদের আর্থিক ক্ষমতায় রাশ, নয়া বিল আনছে রাজ্য সরকার

পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় এক আমূল ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। সাম্প্রতিক পাওয়া খবর অনুযায়ী, গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানদের আর্থিক ক্ষমতার ওপর এক বড়সড় ও নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ জারি করতে চলেছে নবান্ন। রাজ্য বিধানসভায় এই সংক্রান্ত একটি নতুন বিল আনার তোড়জোড় ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই নতুন আইন কার্যকর হলে পঞ্চায়েত প্রধানদের পরিবর্তে সরকারি আধিকারিকদের হাতে আর্থিক ক্ষমতা ও নথিপত্রের নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সরকারি প্রকল্পের কাজে গতি আনার লক্ষ্যেই এই গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে আর্থিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ রাজ্য সরকারের কাছে জমা পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়নের নামে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া এবং প্রধানদের একক সিদ্ধান্তে সরকারি অর্থ ব্যয় ও প্রকল্পের কাজে অস্বচ্ছতার যে অভিযোগ উঠেছে, তা দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখার পরেই রাজ্য সরকার এই আইনি পদক্ষেপের পথে এগিয়েছে। নতুন বিলের খসড়া অনুযায়ী, এবার থেকে পঞ্চায়েতের যাবতীয় আর্থিক লেনদেন, বিল পাস এবং প্রতিটি প্রকল্পের খরচের হিসাব সরাসরি সরকারি আধিকারিকদের তত্ত্বাবধানে থাকবে। এর ফলে প্রধানরা আর এককভাবে কোনো বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। প্রতিটি খরচের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন এবং অডিট প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের যে মূল কাঠামো রয়েছে, তার ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই বেড়ে যাবে। এতদিন নির্বাচিত প্রধানদের হাতে যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছিল, তাতে লাগাম পরানোই এই নতুন বিলের মূল উদ্দেশ্য। সরকারি আধিকারিকরা এখন থেকে প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণ এবং খরচের অডিট করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। যদিও রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তকে একটি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবেই দেখছে, তবুও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষ থেকে এই বিল নিয়ে তীব্র সমালোচনার সুর শোনা যাচ্ছে। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা খর্ব করে সরকারি আমলাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া আদতে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সমান। তাদের মতে, এটি জনস্বার্থের চেয়ে প্রশাসনিক কর্তৃত্ববাদের পথকে আরও প্রশস্ত করবে।

রাজ্য পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে নবান্নের অন্দরে এই বিলের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খুব শীঘ্রই বিধানসভার শীতকালীন বা পরবর্তী অধিবেশনে এই বিলটি উত্থাপন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিলটি আইন হিসেবে কার্যকর হলে গ্রাম স্তরে প্রশাসনিক কাজের গতিপ্রকৃতি যে পুরোপুরি বদলে যাবে, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষত গ্রামীণ উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিতে দুর্নীতির অভিযোগ কমাতে এই নয়া ব্যবস্থা কতটা সফল হয়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন সাধারণ মানুষ ও সমাজবিজ্ঞানীরা।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক অতীতে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না বলে মনে করছেন প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা। সরকারি আধিকারিকরা এখন প্রতিটি খরচের ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারি চালাবেন, যা সরকারি প্রকল্পের প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে সুবিচার ও উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে। প্রধানদের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় স্থানীয় রাজনীতিতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রাক্কালে বা মাঝামাঝি সময়ে এই ধরণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে তীব্র চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। রাজ্য সরকার আগামী দিনে এই আইন কার্যকর করার মাধ্যমে গ্রামীণ স্বশাসিত সংস্থাগুলিকে কতটা দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ করতে পারে, সেই দিকে নজর থাকবে গোটা রাজ্যের মানুষের। এই পরিবর্তন একদিকে যেমন প্রশাসনিক শৃঙ্খলার দিশা দেখাচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক মহলের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার লড়াইকেও এক নতুন মোড় দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আইনটি পাশ হওয়ার পর তার প্রয়োগ কতটা ফলপ্রসূ হয় এবং তৃণমূল স্তরে এর প্রভাব কী দাঁড়ায়।