বিমানবন্দর চত্বরে মসজিদে প্রবেশে কড়াকড়ি, বিকল্পের খোঁজে স্থানীয়রা

কলকাতা বিমানবন্দর চত্বরের অভ্যন্তরে অবস্থিত প্রাচীন মসজিদটিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রবেশাধিকারের ওপর আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে বাঁকড়া অঞ্চলের জনজীবনে এক গভীর সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই মসজিদটি শুধুমাত্র একটি উপাসনালয় নয়, বরং স্থানীয়দের সামাজিক ও ধর্মীয় মেলবন্ধনের এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে সমাদৃত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিধি কঠোর করার দোহাই দিয়ে এই প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ করায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম বিপাকে পড়েছেন।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলির নিরাপত্তা প্রোটোকল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বিশেষত বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা হুমকির প্রেক্ষিতে বিমানবন্দরের প্রতিটি ইঞ্চি এলাকা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার আওতায় রাখা বাঞ্ছনীয়। এই যুক্তিতেই কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের সংরক্ষিত অঞ্চলে বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছে। এর সরাসরি শিকার হয়েছে বাঁকড়া সংলগ্ন এই মসজিদটি। দীর্ঘকাল ধরে যে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই পরিচয়পত্র দেখিয়ে বা পূর্ব পরিচিত প্রহরীদের মাধ্যমে এই মসজিদে প্রবেশের সুযোগ পেতেন, বর্তমান কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে তাদের সেই পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। এখন শুধুমাত্র বিমানবন্দরের বৈধ পরিচয়পত্রধারী কর্মী ছাড়া অন্য কারোর পক্ষেই এই সীমানা প্রাচীর অতিক্রম করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিষয়টি কেবল ধর্মীয় উপাসনার সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে নেই, বরং এটি তাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক বড় অংশকে ব্যাহত করছে। বাঁকড়া এলাকার শ্রমিক এবং নিম্নবিত্ত মানুষজন যারা মূলত বিমানবন্দর সংলগ্ন অঞ্চলে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের জন্য এই মসজিদটি ছিল সবচেয়ে নিকটবর্তী স্থান। বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, যারা শারীরিকভাবে বেশ কিছুটা পথ হাঁটার ক্ষমতা রাখেন না, তাদের জন্য বর্তমানে নিকটস্থ অন্যান্য মসজিদে যাতায়াত করা কার্যত দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। শুক্রবারের জুম্মার নমাজে অংশগ্রহণ করা তো দূরের কথা, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়ার ক্ষেত্রেও এখন তাদের মাইলের পর মাইল পথ অতিক্রম করে বিকল্প মসজিদের সন্ধান করতে হচ্ছে। এটি কেবল শারীরিক পরিশ্রম নয়, বরং সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুলও বটে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের বক্তব্য হলো, মসজিদটি বিমানবন্দরের মূল রানওয়ে বা টার্মিনাল ভবন থেকে বেশ কিছুটা দূরে অবস্থিত। তাদের দাবি, কর্তৃপক্ষ চাইলে একটি নির্দিষ্ট পথ বা করিডোর তৈরি করে দিয়ে সাধারণ মানুষকে মসজিদে প্রবেশের অনুমতি দিতেই পারত। এতে বিমানবন্দরের মূল নিরাপত্তা বলয় কোনোভাবেই বিঘ্নিত হতো না। কিন্তু যথাযথ আলোচনার পরিবর্তে একতরফাভাবে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় জনমনে ক্ষোভের দানা বেঁধেছে। তাদের মতে, নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব ছিল, যা কর্তৃপক্ষ করেনি।

এই জটিল পরিস্থিতিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষের সাফ কথা, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার শৈথিল্য প্রদর্শন করা আইনত সম্ভব নয় এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলতে তারা বদ্ধপরিকর। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরের এই সংবেদনশীল এলাকাটিতে নিরাপত্তার বিষয়টিকেই তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক স্তরেও এই বিষয়টি নিয়ে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। সরকারি নথিপত্রে এই মসজিদটির মালিকানা, জমির স্বত্ব এবং ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত তথ্যে অস্পষ্টতা থাকায় বিষয়টি আইনি গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছে। মসজিদটি ঠিক কোন জমিতে অবস্থিত এবং তার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কাদের, তা নিয়ে স্পষ্ট প্রমাণের অভাবে স্থানীয়দের দাবি পেশের পথও কিছুটা সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, যাত্রী সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনই স্থানীয় বাসিন্দাদের ধর্মীয় ও সামাজিক চাহিদার প্রতিও কর্তৃপক্ষের নমনীয় মনোভাব পোষণ করা উচিত। তারা মনে করছেন, প্রশাসন যদি এই বিষয়ে একটু সহনশীল ভূমিকা নেয় এবং বিকল্প কোনো সমাধানসূত্র বের করে, তবেই সমস্যার সুরাহা সম্ভব। কিন্তু আপাতত, বাঁকড়া এলাকার বাসিন্দাদের কাছে বিমানবন্দরের অদূরে অবস্থিত বিকল্প মসজিদগুলোতে যাতায়াত করাই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভবিষ্যতে যদি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হয়, তবে স্থানীয়দের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই ক্ষোভ যেকোনো সময় বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নিতে পারে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে। বাঁকড়া এলাকার মানুষ ধৈর্য ধরে থাকলেও তাদের সহ্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম হয়েছে। সকলেরই আশা, প্রশাসনিক স্তরে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এমন একটি পথ বেরিয়ে আসবে যেখানে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা রক্ষা পাবে এবং একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দিন গুনছে বাঁকড়ার মানুষ।