কলকাতা বিমানবন্দরের মসজিদে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, এলাকায় কড়া নিরাপত্তা

কলকাতা বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ অপারেশনাল এলাকায় অবস্থিত একটি মসজিদকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রতিক বিতর্ক ও উত্তেজনা প্রশাসনিক স্তরে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে নিরাপত্তার কারণ দর্শিয়ে সেখানে নামাজ পড়ার ওপর যে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয় স্তরে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এক ধর্মীয় নেতার আহ্বানে আগামী শুক্রবার বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন উভয়ই যথেষ্ট সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

বিমানবন্দরের পরিচালনাগত বা অপারেশনাল এলাকা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং উচ্চ নিরাপত্তার আওতাভুক্ত। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার খাতিরেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বলয় অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় সেখানে বাইরের কোনো ব্যক্তি বা অননুমোদিত মানুষের অবাধ প্রবেশ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ এলাকায় নিরাপত্তার মানদণ্ড আন্তর্জাতিক স্তরের, আর সেই নিরাপত্তা রক্ষায় কোনোভাবেই আপস করা সম্ভব নয়। গত কয়েকদিন ধরেই এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে, যা ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে, মসজিদ কমিটির দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা জানিয়েছে, তাদের কাছে এমন প্রয়োজনীয় সরকারি নথিপত্র রয়েছে যা ওই স্থানে নিয়মিত নামাজ পড়ার অনুমতি দেয়। কমিটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, কোনো রকম পূর্ব নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ করে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যা স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় আবেগের পরিপন্থী এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী। তারা মনে করছেন, দশকের পর দশক ধরে যেখানে প্রার্থনা চলছে, সেখানে হঠাৎ নিরাপত্তা অজুহাতে এই নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক। তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের অবস্থানে অনড়। তারা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো সম্ভব নয়। বর্তমানে ওই এলাকায় পুলিশ এবং বিমানবন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং গোটা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ওই এলাকায় বড় ধরনের জমায়েত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ওই দিন বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনকে বাড়তি সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে। যদি এই বিক্ষোভ কর্মসূচি বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তবে বিমানবন্দরের যাত্রীদের স্বাভাবিক যাতায়াত এবং বিমান চলাচলের সময়সূচী ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই পুলিশি টহলদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে গোটা এলাকার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

মসজিদ কমিটির সদস্যরা আরও জানিয়েছেন, বছরের পর বছর ধরে এখানে নামাজ আদায় করা হচ্ছে, তাই আচমকা এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। তবে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। আপাতত পরিস্থিতি পর্যালোচনার কাজ চলছে এবং সরকারি স্তরে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তাই এক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র শিথিলতা দেখাতে নারাজ উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা আধিকারিকরা।

বর্তমানে ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ওপর অত্যন্ত কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। যথাযথ পরিচয়পত্র যাচাই না করে কাউকে ওই চত্বরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনার টেবিলে মেটানোর কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে কোনো সরকারি বিবৃতি এখনও পাওয়া যায়নি। তবে বিমানবন্দরের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ ও বিমানবন্দরের সুরক্ষা আধিকারিকরা জানিয়েছেন। আগামী শুক্রবারের কর্মসূচির গতিপ্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কয়েক গুণ জোরদার করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলে দফায় দফায় আলোচনা চলছে।

রাজ্য পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা এবং বিমানবন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তা বিভাগের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় রক্ষা করা হচ্ছে। বিমানবন্দরের ভেতরে কর্মরত কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। যে এলাকায় মসজিদটি অবস্থিত, সেখানে নিরাপত্তা কর্মীদের সংখ্যাও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় কোনো ধরনের অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা যাতে যাত্রীদের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত না করে, তা নিশ্চিত করাই বর্তমান প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়ে প্রশাসন থেকে বার্তা দেওয়া হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও পুলিশের তরফে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে।