কলকাতার রাজনীতির ক্যালেন্ডারে ২১ জুলাই একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আবেগময় দিন। ১৯৯৩ সালের এই দিনে তৎকালীন যুব কংগ্রেসের প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৩ জন তরুণ কর্মী। সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। আজ ২০২৩-এর পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে যখন একুশে জুলাই আসে, তখন কলকাতার বুকে ধেয়ে আসা মানুষের ঢল আর বিশাল জনসভার আড়ালে এক অদ্ভুত বাস্তবতার ছবি ফুটে ওঠে। সেই শহিদ পরিবারগুলির অন্দরে উঁকি মারলে দেখা যায়, রাজনৈতিক আনুগত্য আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই এই দিনটি ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ভিত বা ভিত্তিপ্রস্তর হলো এই দিনটি। প্রতি বছর একুশের ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শহিদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তাঁদের পাশে থাকার দৃঢ় বার্তা দেন। কিন্তু রাজনীতির সেই ঝকঝকে মঞ্চের আড়ালে বা শহিদ পরিবারের অন্দরের প্রকৃত চিত্রটি ঠিক কী? অধিকাংশ শহিদ পরিবারের সদস্য আজও সেই রাজনৈতিক আস্থার ওপর ভরসা করেই তাঁদের দিন গুজরান করছেন। তবে তাঁদের অনেকেরই চাপা আক্ষেপ, সময় বদলালেও এবং ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও তাঁদের জীবনযাত্রার মান সেভাবে আশানুরূপ উন্নত হয়নি।
শহিদ পরিবারের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনুগত্যের প্রশ্নে তাঁরা আজও আপোষহীন। তাঁদের মতে, যে আন্দোলনের জন্ম এই আত্মত্যাগ থেকে হয়েছিল, সেই রাজনৈতিক দলটির সঙ্গেই তাঁরা মানসিকভাবে এবং ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট বা পরিবারের নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের প্রশ্নে তাঁরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। অনেক পরিবারের অভিযোগ, রাজনীতির মঞ্চে তাঁদের নাম বারবার ব্যবহৃত হলেও ব্যক্তিগত স্তরে অনেক সময় সেই কাঙ্ক্ষিত সহায়তা বা সুযোগ-সুবিধা পৌঁছাতে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমান সময়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখাই এখন তাঁদের কাছে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
একদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আদর্শ, অন্যদিকে সংসারের প্রতিদিনের কঠিন লড়াই—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে শহিদ পরিবারগুলি আজ এক চরম দোলাচলে। অনেকেরই মনে আক্ষেপ, বহু বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও শহিদ পরিবারের মর্যাদা বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির যে প্রত্যাশা তাঁদের ছিল, তা পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ হয়নি। কোথাও যেন এক ধরনের গুমরে থাকা কষ্ট রয়ে গেছে। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করে, শহিদ পরিবারগুলির প্রতি দলগুলোর যে দায়বদ্ধতা, তা কেবলমাত্র মঞ্চের ভাষণে বা বার্ষিক স্মারক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধানই হবে তাঁদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালের সেই ঘটনার পর থেকে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ বহুবার বদলেছে। শহিদদের স্মরণে তৈরি হয়েছে স্তম্ভ, পালিত হয়েছে বিশাল জনসভা। কিন্তু সময় পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো ক্ষতগুলো কি আদৌ শুকিয়েছে? নাকি রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে সেই সব পরিবারগুলোর ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাস? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা। তথ্যের সীমাবদ্ধতা থাকায় এই মুহূর্তে প্রতিটি শহিদ পরিবারের সুনির্দিষ্ট আর্থিক পরিস্থিতির বিশদ পরিসংখ্যান দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তাঁদের বর্তমান অবস্থান যে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে, তা স্পষ্ট।
কলকাতার রাজনীতির ইতিহাসে একুশে জুলাইয়ের মাহাত্ম্য অপরিসীম। এটি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু শহিদ পরিবারের সদস্যদের চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসের অডিট কি আদৌ কেউ করবে? রাজনৈতিক আনুগত্যের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতে তাঁরা আজ ক্লান্ত। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে জনমানসে প্রশ্ন উঠছে, তাঁদের সম্মান আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে কোনো ভারসাম্য বা সমন্বয় কি আদৌ সম্ভব? এই উত্তর খুঁজছে তিলোত্তমা। শহিদদের রক্ত বৃথা যায়নি—এই স্লোগানের আড়ালে তাঁদের পরিবারের মানুষগুলো যেন কেবল স্মারক না হয়ে ওঠেন, বরং তাঁদের জীবনযাত্রায় উন্নয়নের স্পষ্ট ছাপ পড়ুক—এটাই আজকের দিনের সামাজিক দাবি। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার খাতিরেই এই পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।








