১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে ২৭ কোটি কর্মদিবসের লক্ষ্যমাত্রা বাংলার

পশ্চিমবঙ্গ সরকার গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবর্ষে ‘১০০ দিনের কাজ’ বা মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্পের আদলে তৈরি একটি বিশেষ প্রকল্পে ২৭ কোটি কর্মদিবস সৃষ্টির উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত রাজ্যের নিজস্ব তহবিল থেকে পরিচালিত ১২৫ দিনের এই বিশেষ প্রকল্পটির মাধ্যমে গ্রামীণ স্তরে কাজের সুযোগ বহুগুণ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার ওপর সর্বতোভাবে জোর দিচ্ছে নবান্ন।

প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ আটকে থাকার ফলে রাজ্যের নিজস্ব উদ্যোগে এই ১২৫ দিনের কাজের প্রকল্পটি অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং দরিদ্রতম পরিবারগুলির হাতে সরাসরি কর্মসংস্থান পৌঁছে দিতে রাজ্য সরকার এই লক্ষ্যমাত্রাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। রাজ্য পঞ্চায়েত দপ্তরের শীর্ষস্থানীয় কর্তারা ইতিমধ্যেই রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসক এবং খণ্ড উন্নয়ন আধিকারিক বা বিডিও-দের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে কাজের পরিকল্পনাগুলি দ্রুত এবং কার্যকরভাবে রূপায়িত হয়।

উল্লেখ্য যে, ২৭ কোটি কর্মদিবস তৈরির এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল অঙ্কের অর্থবরাদ্দের বিষয়টি রাজ্য বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে রাখা হয়েছে। রাজ্যের স্পষ্ট দাবি, গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। রাস্তা তৈরি, সেচ খাল সংস্কার, পুকুর খনন এবং বৃক্ষরোপণের মতো জনমুখী কাজগুলিতে এই শ্রমিকদের কাজে লাগানো হবে। এতে একদিকে যেমন গ্রামীণ সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

এই প্রকল্পের সফল এবং নিরবচ্ছিন্ন রূপায়ণের জন্য প্রতিটি ব্লকে নিয়মিত তদারকি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাজের স্বচ্ছতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সামাজিক অডিট বা সোশ্যাল অডিটের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে, যাতে দুর্নীতির কোনো অবকাশ না থাকে। রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী জানিয়েছেন, গ্রামীণ মানুষের মুখে অন্ন জোগানো এবং স্থানীয় স্তরে স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি করাই বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রধান লক্ষ্য। বিগত বছরগুলিতে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে রাজ্য সরকার যেভাবে নিজস্ব প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে নিয়ে গেছে, তাতে এবার লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়ে ২৭ কোটিতে নিয়ে যাওয়া হলো, যা রাজ্যের গ্রামীণ উন্নয়নের প্রতি দায়বদ্ধতারই পরিচয় দেয়।

যদিও বিরোধীদের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে মাঝে মধ্যেই নানাবিধ প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তবে রাজ্য প্রশাসন সমস্ত অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। সরকারের দাবি, বাংলার শ্রমিকদের স্বার্থে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এই প্রকল্প নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে। বর্তমানে প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে যোগ্য সুবিধাভোগীদের তালিকা পুনরায় যাচাই করে কাজের কার্ড প্রদানের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হয় এবং কোনো প্রকৃত শ্রমিক যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়েন।

পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার কাজেও এই কর্মদিবসগুলিকে ব্যবহারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের দাবি, ১০০ দিনের প্রকল্পের অভাব পূরণ করতে এই ১২৫ দিনের প্রকল্প এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। কেন্দ্রীয় বঞ্চনার দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বাংলার গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এই নতুন মডেল এখন কতটা সফল হয়, সেটাই দেখার বিষয়। তবে ২৭ কোটি কর্মদিবসের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হলেও রাজ্য সরকার এই বিষয়ে যথেষ্ট আশাবাদী। কাজের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি শ্রমিকদের সঠিক সময়ে মজুরি প্রদান নিশ্চিত করতে ডিজিটাল পেমেন্ট বা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থার (ডিবিটি) ওপরও জোর দিচ্ছে পঞ্চায়েত দপ্তর। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি নিয়ে জেলায় জেলায় উচ্চপর্যায়ের সমীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবান্ন, যাতে কোনো পর্যায়েই কাজে খামতি না থাকে। সামগ্রিক বিচারে, এই প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।