রাজ্যে লাগামহীন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বিশেষ করে চিনির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনায় নবান্নে জরুরি বৈঠক ডাকলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বর্তমান বাজারে চিনির দাম যেভাবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। এদিন খাদ্য দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই বৈঠকে মজুতদার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বৈঠক সূত্রে খবর, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অসাধু ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চিনির দাম আকাশছোঁয়া করে তুলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার এই প্রধান উপকরণটির দাম হু হু করে বাড়ায় চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে জনমানসে। এই অস্থির পরিস্থিতির মোকাবিলায় অবিলম্বে রাজ্যের সমস্ত বাজারগুলিতে নজরদারি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ে বা তাদের নিত্যদিনের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, এমন কোনো বিষয় বর্তমান সরকার কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না। খাদ্য দপ্তরের পরিদর্শকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, রাজ্যের সর্বত্র পাইকারি ও খুচরো বাজারে নিয়মিত তল্লাশি চালাতে। যদি কোথাও অবৈধভাবে চিনি মজুত করার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে তাদের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু করা হবে।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক অতীতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রাজ্য সরকার কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে অভিযোগ তুলছে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। তবে বর্তমান শাসক দল বিজেপি এই দায়ভার নিতে নারাজ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতির ওপর সর্বক্ষণ নজর রাখছে এবং খুব দ্রুত চিনির দাম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তিনি অসাধু ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই দুর্দিনে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে মুনাফা লুটলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সরকারের কাজ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আর সেই লক্ষ্যে প্রশাসন তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, খাদ্য দপ্তরের সচিবকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে প্রতিদিনের বাজারদরের রিপোর্ট সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে পৌঁছায়। প্রতিটি জেলায় আলাদা করে টাস্ক ফোর্স গঠন করে নিয়মিত বাজার পরিদর্শনের নির্দেশ জারি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আধিকারিকদের পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছেন যে, চিনির সাপ্লাই চেইন বা জোগান ব্যবস্থা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। পাশাপাশি, পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার কথাও ভাবছে রাজ্য প্রশাসন। আমদানিকারক এবং উৎপাদকদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে যাতে বাজারে পণ্যের জোগান বজায় থাকে।
বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে কেবল লোক দেখানো বলে কটাক্ষ করেছে। তাদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে চাল, ডাল থেকে শুরু করে চিনির দাম বাড়লেও সরকার আগে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ করেনি। এখন পরিস্থিতির চাপ বুঝে তড়িঘড়ি সভা ডাকা হয়েছে। তবে রাজ্য প্রশাসনের দাবি, সরকার সবসময় সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত ব্যবধানে পর্যালোচনা বৈঠক চলবে।
রাজ্য জুড়ে সাধারণ মানুষ এখন এই সরকারি কড়াকড়ির ফলে চিনির দাম কতটা কমবে, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছেন। পাইকারি বাজারগুলোতে অস্থিরতা কাটাতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন খাদ্য দপ্তরের আধিকারিকরা। বাজারে চিনির ঘাটতি মেটাতে প্রয়োজনে সরকারি ভাণ্ডার থেকে বিশেষ বিক্রয়কেন্দ্র খোলার চিন্তাভাবনাও করা হচ্ছে বলে নবান্নের অন্দরের খবর। ভবিষ্যতে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলেও জল্পনা ছড়িয়েছে প্রশাসনিক মহলে। বিস্তারিত তথ্যাদি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্দেশিকায় জানানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো, মজুতদারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে বাজারের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরে যাতে স্বস্তি ফেরে তা নিশ্চিত করা। রাজ্য প্রশাসন সাধারণ মানুষের আস্থার মর্যাদা রাখতে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করছে।








