যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক ঘটনার তদন্তে গতি বাড়াতে তৎপর কলকাতা পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ জন ছাত্রের বিস্তারিত নথিপত্র চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে নোটিশ পাঠাল পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাক্রমের সূত্র ধরেই এই পদক্ষেপ বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি-র পক্ষ থেকে এই তালিকা চাওয়া হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অন্দরের পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য রাজনীতি সরগরম। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। বিগত দিনে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি যেভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল, বর্তমান শাসক দল বিজেপি তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটছে। শাসক দল বিজেপির অন্দরেও এই ঘটনা নিয়ে একাধিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে, অন্যদিকে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে রাজ্য সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে।
তদন্তকারী পুলিশ অফিসারদের দাবি, যে ১৮ জন ছাত্রের নাম তালিকায় রয়েছে, তাদের ভূমিকা গত কয়েকদিনের অস্থিরতায় কতটা ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টারকে দেওয়া চিঠিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই সমস্ত শিক্ষার্থীদের নাম, বর্তমান ঠিকানা, বিভাগ, রোল নম্বর এবং তাদের বিগত কয়েক মাসের কার্যকলাপের রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ডিসিপ্লিনারি কমিটি বা শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির কাছে এদের বিষয়ে কোনো অভিযোগ আগে থেকে ছিল কি না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং অন্যান্য আধিকারিকদের সঙ্গে এই বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করেছেন পুলিশ প্রতিনিধিরা। পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে কারো ব্যক্তিগত তথ্যে গোপনীয়তা বজায় রাখা হবে, তবে আইনভঙ্গের কোনো প্রমাণ মিললে কাউকে রেহাই দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, ছাত্রছাত্রীদের একাংশ পুলিশের এই সক্রিয়তাকে ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ বলে অভিহিত করেছেন। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসিত অধিকারে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে প্রশাসন। এই ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্ররা অভিযোগ করেছেন, বর্তমান সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে রাজনীতিকরণের চেষ্টা করছেন। তারা মনে করছেন, ১৮ জন ছাত্রের নাম চেয়ে পাঠিয়ে আসলে সাধারণ পড়ুয়াদের মধ্যে ভীতি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের দাবি, ক্যাম্পাসের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই পুলিশ এই কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলের প্রশাসনিক শৈথিল্যই আজকের পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে বিজেপির তরফে পালটা তোপ দাগা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই মুহূর্তে অত্যন্ত সতর্ক। উপাচার্য জানিয়েছেন, পুলিশি নির্দেশিকা পাওয়ার পর তা আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের জন্য পাঠানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কোনোভাবেই আইনের পরিপন্থী কাজ করতে চায় না, আবার পড়ুয়াদের হয়রানিও সমর্থন করে না। আগামিকাল এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেই বৈঠকের পরেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পুরো পরিস্থিতি নিয়ে এখন শহর কলকাতায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে। শহরবাসী এবং অভিভাবকরাও এই ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর রাখছেন। ক্যাম্পাসে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক ভবনের সামনে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে। ঘটনাটি বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টের নজরেও রয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এদিন স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, তদন্তে কোনো প্রকার গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পড়ুয়া ও স্থানীয় নাগরিক সমাজও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলে সরব হয়েছেন বিদ্বজ্জনরাও। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই ১৮ জন ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লালবাজারে তলব করা হতে পারে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে। তবে তদন্তের খাতিরে সেই তালিকা বা সময়ের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য এখনো সরকারিভাবে জানানো হয়নি।








