কলকাতার অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন খাদ্য বিপণি এবং রেস্তোরাঁগুলিতে নজরদারি চালাতে গিয়ে এক বড়সড় দুর্নীতির পর্দাফাঁস করল কলকাতা পুরসভা। শহরের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের খবর সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে পুর প্রশাসন। গত কয়েকদিনের নিবিড় অভিযানে পুরসভার স্বাস্থ্য দফতর মোট ১ হাজার ২২৪ কেজি এমন খাদ্যসামগ্রী বাজেয়াপ্ত করেছে, যা মানুষের খাদ্য গ্রহণের সম্পূর্ণ অযোগ্য এবং স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অভিযানের ফলে শহরের খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
পুরসভা সূত্রে খবর, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে চালানো এই আকস্মিক পরিদর্শনের সময় দেখা গিয়েছে যে, একাধিক খাদ্য প্রস্তুতকারী সংস্থা এবং নামী-দামি রেস্তোরাঁয় অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্নাবান্না করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পচা, বাসি এবং তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত খাবার ফ্রিজে মজুত করে রাখা হয়েছিল, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই গুরুতর অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুরসভা। নিয়ম ভাঙার অপরাধে এবং খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড লঙ্ঘনের দায়ে মোট ৪০টি দোকানের লাইসেন্স তৎক্ষণাৎ বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া আরও ১১২টি সংস্থাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুর আধিকারিকরা জানিয়েছেন, শহরের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং খাদ্যের গুণমান বজায় রাখতে এই ধরনের অভিযান নিয়মিত এবং ধারাবাহিকভাবে চালানো হবে। বাজেয়াপ্ত করা ১ হাজার ২২৪ কেজি খাবার পুরসভার পক্ষ থেকে অবিলম্বে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। অভিযানে নেমে যে দৃশ্য পুরকর্মীরা দেখেছেন, তা রীতিমতো আতঙ্কজনক। অনেক জায়গায় দেখা গিয়েছে, রান্নার সামগ্রী রাখার জায়গা অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন এবং সেখানে আরশোল্লা বা ইঁদুরের মতো কীটপতঙ্গ ও প্রাণীর অবাধ বিচরণ রয়েছে। এই ধরনের নোংরা পরিবেশে তৈরি খাবার খেলে সাধারণ মানুষ মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতা, যেমন—পেটের পীড়া, টাইফয়েড বা ফুড পয়জনিং-এর মতো রোগের শিকার হতে পারেন।
পুরসভার এই কঠোর পদক্ষেপে ব্যবসায়ীদের অন্দরেও প্রবল চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। লাইসেন্স বাতিল হওয়া ব্যবসায়ীদের সাফ জানানো হয়েছে যে, যদি তারা তাদের পরিকাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে এবং পুরসভার সমস্ত নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে, তবেই ভবিষ্যতে তাদের লাইসেন্স পুনর্বিবেচনার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। নতুবা তাদের কঠোরতম আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনীতিতেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিরোধী দলের নেতাদের অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসন আসার পর থেকেই শহরে আইন-শৃঙ্খলার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধির চরম অবনতি ঘটেছে। অন্যদিকে, সরকারের উচ্চস্তর থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, খাদ্য সুরক্ষায় কোনো ধরনের আপস করা হবে না। এই অভিযানের মাধ্যমে সরকারের সেই কঠোর অবস্থানই জনসমক্ষে ফুটে উঠেছে।
উল্লেখ্য, অতীতের প্রশাসনিক শিথিলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বর্তমান প্রশাসন। তবে সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে লাইসেন্স বাতিল করলেই হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী তদারকির স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। শহরের প্রতিটি রেস্তোরাঁ এবং খাদ্য বিপণিতে যাতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর গুণগত মান যাচাই করা হয়, সেই দাবি জোরালো হচ্ছে। পুরসভার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও, শহরের প্রতিটি সচেতন মানুষ এই ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তির প্রত্যাশা করছেন। আগামী দিনে এই ধরনের অভিযান আরও জোরদার এবং ব্যাপক করা হবে বলে পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
শহরের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক তদারকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে, সাধারণ মানুষের সচেতনতাও বাড়ানো প্রয়োজন। রেস্তোরাঁয় বসে বা রাস্তা থেকে খাবার কেনার সময় গ্রাহকদেরও সতর্ক হতে হবে। খাবারের গুণমান নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলে অবিলম্বে পুরসভায় অভিযোগ জানানোর জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করা হয়েছে। পুরসভার এই সাহসী পদক্ষেপ শহরবাসীর আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। মানুষ এখন দেখতে চাইছে, এই অভিযান কি শুধু লোকদেখানো নাকি দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা। তবে আপাতত, কলকাতার খাদ্য মানচিত্রের অন্ধকার দিকগুলো প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনের এই সক্রিয়তা প্রশংসা কুড়োচ্ছে।








