নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনে শহরে সিল ৪০টি রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকান

কলকাতা পৌরনিগমের সাম্প্রতিক কঠোর অভিযান শহরজুড়ে খাদ্য ও পানীয় শিল্পমহলে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অগ্নি নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যবিধির গুরুতর লঙ্ঘনের দায়ে কলকাতার প্রায় ৪০টি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ এবং নামী মিষ্টির দোকানকে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পৌরনিগমের এই পদক্ষেপে শহরের খাদ্যরসিকদের একাংশের মধ্যে যেমন চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তেমনই সাধারণ নাগরিকদের একাংশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে শহরতলি পর্যন্ত বিস্তৃত এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল যে, তারা উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই মুনাফামুখী ব্যবসা পরিচালনা করছিল, যা জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিশাল ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কলকাতা পৌরনিগমের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই বিশেষ অভিযানটি পরিকল্পিতভাবে চালানো হয়েছে। মূলত শহরের বড় শপিং মল, জনবহুল বাণিজ্যিক এলাকা এবং রাস্তার ধারের ছোট-বড় খাবার দোকানগুলিকে এই কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করা সম্ভব নয়। সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রান্নাঘরে ধোঁয়া বেরোনোর জন্য পর্যাপ্ত ‘চিমনি’ বা ভেন্টিলেশনের অভাব রয়েছে, অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ অনেক আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচানোর জন্য যে জরুরি প্রস্থানের পথ বা ‘ইমার্জেন্সি এক্সিট’ থাকা প্রয়োজন, তা আসবাবপত্র কিংবা মজুত পণ্যের দ্বারা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

পৌরনিগমের তরফে অভিযুক্ত সমস্ত রেস্তোরাঁ এবং মিষ্টির দোকানের মালিকদের আগামী দুই সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই তাদের সমস্ত অসংগতি দূর করে পরিকাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্নি নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও পরিকাঠামো ঠিক করা না হয়, তবে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে ওই প্রতিষ্ঠানগুলির ট্রেড লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। কলকাতার ক্রমবর্ধমান খাদ্য সংস্কৃতির প্রসারে এবং শহরবাসীর সুরক্ষার স্বার্থে এই ধরণের প্রশাসনিক কড়াকড়ি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন নগরপরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

উল্লেখ্য যে, রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে বারংবার জোর দিয়ে বলেছেন যে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় এই ধরণের নিয়মাবলির প্রয়োগে শৈথিল্যের যে অভিযোগ উঠত, তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান শাসকদল বিজেপি বদ্ধপরিকর বলে দাবি করেছেন দলের স্থানীয় নেতৃত্ব। যদিও বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই অভিযান নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি, তবুও পৌরনিগমের এই কড়া পদক্ষেপে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন এটি ব্যবসার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, আবার অনেকেই মনে করছেন নিরাপত্তার খাতিরে এটি একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।

পৌরনিগমের তরফে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, শহরের বিভিন্ন এলাকায় এই অভিযান আগামী দিনগুলিতে আরও জোরদার করা হবে। যে সমস্ত রেস্তোরাঁ এবং মিষ্টির দোকান বর্তমানে সমস্ত সরকারি নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে নিয়ম লঙ্ঘন করলে কাউকেই বিন্দুমাত্র রেয়াত করা হবে না। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে নজরদারি বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের ভুল সংশোধন করে পুনরায় যথাযথ নথিপত্র জমা দিলে তবেই তা খতিয়ে দেখে খোলার অনুমতি দেওয়া হবে।

পৌরনিগমের এই কঠোর বার্তার পর শহরের বড় বড় রেস্তোরাঁ চেইন এবং নামী ক্যাফেগুলি ইতিমধ্যে তাদের পরিকাঠামো দ্রুতগতিতে খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে। খাদ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি যে এবার থেকে বরদাস্ত করা হবে না, তা এই পদক্ষেপের মাধ্যমেই প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে। পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে পৌর প্রশাসন। সব মিলিয়ে কলকাতার খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনজীবনের সুরক্ষার ক্ষেত্রে এই প্রশাসনিক পদক্ষেপটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল, যা ভবিষ্যতে আরও কঠোর নিয়মানুবর্তিতার পথ প্রশস্ত করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং শহরের সামগ্রিক পরিবেশকে নিরাপদ রাখতে এই ধরনের উদ্যোগ সত্যিই সময়োপযোগী।