মালদহে বিপৎসীমার উপরে গঙ্গা, প্লাবিত বিস্তীর্ণ এলাকা, লক্ষাধিক মানুষ দ

মালদহ জেলায় গঙ্গার জলস্তর বিপদসীমা অতিক্রম করায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, নদী তীরবর্তী একাধিক ব্লকের অন্তত আড়াই লক্ষ মানুষ নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির কবলে পড়েছেন। গঙ্গার জলস্তর হু হু করে বেড়ে চলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ এবং ওপরের রাজ্য থেকে আসা জলের চাপে নদী বাঁধের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

প্রশাসনিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মালদহের কালিয়াচক এবং মানিকচক ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে জলের নিচে। গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বহু মানুষ নিজেদের বসতবাড়ি ছেড়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দুর্গত এলাকার মানুষকে উদ্ধার করার জন্য রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন তৎপরতার সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য ত্রাণ শিবিরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বন্যা পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছেন। নবান্নের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠানো হয়েছে যাতে বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্য, পানীয় জল এবং ওষুধের জোগান ঠিক থাকে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার জন্য কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। রাজ্যের শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকেও স্থানীয় নেতাদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ত্রাণ বণ্টনে গাফিলতি হচ্ছে। তারা দ্রুত সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছে।

মালদহ জেলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে প্রশাসনিক আধিকারিকরা জানিয়েছেন যে, গঙ্গার জলস্তর যেভাবে বাড়ছে তা রুখতে প্রয়োজনীয় মেরামতির কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চালানো হচ্ছে। নদী বাঁধের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে বালির বস্তা ফেলার কাজ চলছে। তবে গঙ্গার জলস্তর কমতে শুরু না করলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় এই এলাকায় বন্যা প্রতিরোধের জন্য যেসব দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে বর্তমান প্রশাসন নতুন করে পর্যালোচনা করছে বলে খবর। বিরোধী দলের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, নদী ভাঙন রোধে আগের সরকারের গৃহীত প্রকল্পগুলি সঠিক রূপায়ণের অভাবে আজ পরিস্থিতির এই অবনতি। সাধারণ মানুষ এখন শুধু সরকারি ত্রাণের দিকে তাকিয়ে নেই, বরং কখন এই বন্যার প্রকোপ থেকে মুক্তি পাবেন, সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

কৃষি জমিতে জল জমে থাকায় ব্যাপক ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। রবি শস্যের এই মরসুমে কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। জেলা কৃষি দপ্তরের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গবাদি পশুর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে কিছু নিচু এলাকায়, যাতে কোনো বড় দুর্ঘটনা না ঘটে। মালদহ জেলার এই সংকটময় সময়ে প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দেখা গেছে। সব মিলিয়ে, মালদহের এই বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ এখন প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকায় প্রশাসনের চিন্তা আরও বেড়েছে। পরিস্থিতির দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে বলে জেলা শাসক দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে।