পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে শিল্পায়নের প্রসারে একগুচ্ছ নতুন ও যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বর্তমান বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বাধীন সরকার রাজ্যে শিল্পের জন্য এক অনুকূল ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে জমি সংক্রান্ত নীতিতে বিশেষ ছাড় দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। দীর্ঘদিনের জমি সিলিং আইন পুরোপুরি তুলে না দিয়ে, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনিক স্তরে গভীর আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্যের সামগ্রিক শিল্পোন্নয়নে গতি আনতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল এবং শিল্প বিশেষজ্ঞরা।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দপ্তরের এক বিশেষ পরামর্শদাতা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, রাজ্য সরকারের বর্তমান নীতি অনুযায়ী জমি সিলিং আইন পুরোপুরি বাতিল করা বা প্রত্যাহার করার কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ, রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থান, সীমিত জমির পরিমাণ এবং জনসংখ্যার অত্যধিক ঘনত্বের কথা মাথায় রেখে এই আইনটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে শিল্পের বিকাশে জমির অপ্রতুলতা বা সমস্যা একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে, যা দূর করতে সরকার নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করতে চলেছে। নির্দিষ্ট কিছু বৃহৎ শিল্প প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সিলিং আইনে সাময়িক ছাড় দেওয়ার সুযোগ রাখা হতে পারে, যাতে শিল্প স্থাপনের কাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যেতে পারে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পড়ে থাকা অনাবাদি বা পতিত জমিগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই জমিগুলো নিলামের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিল্পপতিদের ব্যবহারের জন্য তুলে দেওয়া হবে। নবান্ন সূত্রে খবর, এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য একটি ডিজিটাল পোর্টাল তৈরি করা হতে পারে। শিল্প প্রকল্পের জন্য জমি ব্যবহারের পাশাপাশি ভূমিহীন কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করাও সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। যে সমস্ত কৃষক বা প্রান্তিক মানুষ জমি হারাবেন, তাঁদের জন্য কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়, বরং উপযুক্ত পুনর্বাসন প্যাকেজ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্যও বিস্তারিত প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় জমি অধিগ্রহণ নীতি নিয়ে রাজ্যে একাধিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, যা রাজ্যের শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ সময় স্তব্ধ করে রেখেছিল। বর্তমান শাসক দল বিজেপি সেই অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। শিল্পায়ন এবং কৃষিজমির সুরক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। রাজ্যের জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যাধিক হওয়ায় প্রতিটি প্রকল্পের জন্য জমি ব্যবহারের আগে অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনা বা ‘ল্যান্ড ইউজ প্ল্যানিং’ করা হচ্ছে। রাজ্যের কৃষিপ্রধান অর্থনীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা যায়, তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ে দফায় দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে এবং শিল্পবান্ধব এক নতুন রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে।
বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস স্বাভাবিকভাবেই এই প্রক্রিয়ায় সরকারের স্বচ্ছতা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কিন্তু সরকার তাদের উন্নয়নমূলক পরিকল্পনায় অবিচল। সরকারি সূত্রের জোর দাবি, রাজ্যের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূর করতে শিল্পায়নই একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী রাস্তা এবং সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই জমি নীতিতে এই সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সরকারি খাস জমি বা পতিত জমিগুলোকে শিল্পের কাজে লাগানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমির ক্ষেত্রেও যাতে জমির মালিকরা বর্তমান বাজারদরের চেয়েও ন্যায্য মূল্য পান, সে বিষয়েও নতুন নির্দেশিকা জারি করার প্রক্রিয়া চলছে।
পরিশেষে বলা যায়, আগামী দিনে শিল্পের এই নতুন জোয়ার রাজ্যকে অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী করে তুলবে বলেই আশাবাদী বর্তমান সরকার। রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের কাছে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তবে শিল্প প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণার আগে সরকার প্রতিটি দিক অত্যন্ত খুঁটিয়ে দেখছে, যাতে সাধারণ মানুষের কোনো স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিল্পায়নের পথেই হাঁটতে চাইছে বর্তমান রাজ্য সরকার, যা বাংলার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য অপরিহার্য।








