সোশ্যাল মিডিয়ায় জাতিবিদ্বেষী মন্তব্য দণ্ডনীয় অপরাধ: কলকাতা হাইকোর্ট

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে লাগামহীন মন্তব্যের ওপর রাশ টানতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিলেন কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাউকে উদ্দেশ্য করে কোনো জাতিবিদ্বেষী বা অপমানজনক মন্তব্য করা হলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই রায়ের ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যারা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ান, তারা এখন থেকে সরাসরি আইনের কোপে পড়তে পারেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ভার্চুয়াল জগত মানেই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তাই কোনো ব্যক্তির জাতি বা পরিচয় নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশিকা বিশেষত বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, বাকস্বাধীনতার নামে কোনো নাগরিক অন্য কোনো গোষ্ঠীর সম্মানহানি করতে পারেন না। এসসি/এসটি আইনের আওতাভুক্ত বিষয়টি নিয়ে আদালত জানিয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে করা মন্তব্যও অপরাধের প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে। বিশেষ করে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) বা ইনস্টাগ্রামের মতো মাধ্যমগুলোতে যেভাবে জাতিবিদ্বেষী পোস্ট বা মন্তব্য ভাইরাল করার প্রবণতা বাড়ছে, তাতে সমাজ ও সম্প্রীতি রক্ষা করতে এই কঠোর অবস্থান প্রয়োজন ছিল।

উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান শাসনব্যবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন সময়ে আইন-শৃঙ্খলার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন আইনজ্ঞরা। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও সামাজিক অস্থিরতা রুখতে আইনি কড়াকড়ির বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে প্রশাসনিক যে কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হতো, বর্তমান শাসক দল বিজেপি সেই জায়গা থেকে সরে এসে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বার্তা দিচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন নয়, বরং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা থাকা জরুরি।

হাইকোর্টের এই নির্দেশ অনুযায়ী, যদি কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট জাতিকে ছোট করে বা অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করে পোস্ট করেন, তবে অভিযোগকারী সরাসরি থানায় এফআইআর দায়ের করতে পারবেন। সাইবার ক্রাইম শাখা সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চালাবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষীর কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিদ্বেষ ছড়ানোর অপরাধকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করছে উচ্চ আদালত।

আদালতের মতে, ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। কোনো সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা মন্তব্য যদি সেই মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে, তবে তা সংবিধান বিরোধী কাজ। আদালতের এই রায়ের পর এখন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। নিজের মত প্রকাশ করতে গিয়ে যাতে অন্য কারও জাতি বা পরিচয় আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, সেই বিষয়ে নজর রাখতে হবে ব্যবহারকারীদের।

বর্তমানে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার যে বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে, সেখানে আদালতের এই রায় সরকারের হাত শক্ত করল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে সাইবার অপরাধের ক্রমবর্ধমান গ্রাফ নিয়ন্ত্রণে এই আইনি কড়াকড়ি বড় ভূমিকা পালন করবে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কতগুলি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, ভবিষ্যতে এ জাতীয় মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বিশেষ সেল বা ট্রাইব্যুনালের কথাও চিন্তা করা হতে পারে।

পরিশেষে, কলকাতা হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের আইন ব্যবস্থার এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। ডিজিটাল দুনিয়ায় কোনো ব্যক্তি যাতে নিজের পরিচয়ের কারণে হেনস্তার শিকার না হন, সেই নিরাপত্তার বলয় তৈরি করতেই এই নির্দেশ কার্যকর করা হয়েছে। রাজ্যের প্রশাসনিক মহলেও এই রায়কে স্বাগত জানানো হয়েছে এবং প্রতিটি জেলা পুলিশকে এই বিষয়ে নির্দেশিকা পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।