২০২১-এর স্বাস্থ্য রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে মমতাকে নিশানা মুখ্যমন্ত্রী শুভ

রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ফের উত্তাপ ছড়িয়েছে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময়কার একটি পুরনো বিতর্কিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শুক্রবার এক সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০২১ সালের একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ওই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে চোট পাওয়ার ঘটনাটি আদতে একটি নাটক ছিল এবং তা জনমানসে সহানুভূতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে সাজানো হয়েছিল। শুভেন্দু অধিকারীর এই মন্তব্যের পরই রাজ্য রাজনীতিতে শাসক দল বিজেপি এবং বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে তরজা চরমে উঠেছে।

শুভেন্দু অধিকারী এদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে দাবি করেন যে, ২০২১ সালের মার্চ মাসে নন্দীগ্রামে প্রচারে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আঘাত পাওয়ার দাবি করেছিলেন, সেই সংক্রান্ত যাবতীয় মেডিকেল নথি পর্যালোচনা করলেই আসল সত্য বেরিয়ে আসে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, রিপোর্টে এমন কোনো গুরুতর আঘাতের উল্লেখ নেই যা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে ওইভাবে হুইল চেয়ারে বসিয়ে প্রচার করতে বাধ্য করেছিল। তিনি সরাসরি আক্রমণ করে বলেন, রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য পরিকল্পিতভাবে জনতাকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল এবং এটি এক ধরনের প্রতারণা। সরকারি পদে আসীন থাকাকালীন এই ধরণের নাটক রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী বলেও তিনি তোপ দাগেন।

এই অভিযোগের পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেনি তৃণমূল কংগ্রেস। বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে শুভেন্দু অধিকারীর এই আচরণকে ‘কুরুচিকর’ এবং ‘নোংরা রাজনীতি’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তৃণমূলের মুখপাত্ররা জানিয়েছেন, একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে আনা কেবল অনৈতিকই নয়, এটি সুপ্রিম কোর্টের গোপনীয়তার অধিকার সংক্রান্ত নির্দেশনার সরাসরি লঙ্ঘন। দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েই এখন পুরনো ইস্যু খুঁচিয়ে প্রাসঙ্গিক হওয়ার চেষ্টা করছেন। গোপনীয়তার অধিকার বা রাইট টু প্রাইভেসি যে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তা মনে করিয়ে দিয়ে শাসক দলকে একহাত নিয়েছে তৃণমূল।

তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, ২০২১ সালে জনগণ রায় দিয়েছিল এবং সেই রায়কে সম্মান না জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এখন ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কুৎসিত রাজনীতিতে নেমেছেন। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য কোনোভাবেই জনসমক্ষে অনুমতি ছাড়া আনা যায় না। এই বিষয়টিকে তারা আইনি লড়াইয়ের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। তৃণমূলের অন্দরের খবর, এই ঘটনায় তারা আইনজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ শুরু করেছেন।

উল্লেখ্য যে, ২০২১ সালের সেই ঘটনার পর নন্দীগ্রামের ভোটপ্রক্রিয়া ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। সেই সময়ে তৃণমূলের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, তাদের নেত্রীকে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপি তখন থেকেই সেই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। আজ দীর্ঘ সময় পর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ফের সেই পুরনো ফাইল প্রকাশ্যে এনে বিষয়টি সামনে আনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন পুরসভা বা উপনির্বাচনগুলোর আবহে জনমানসে পুরনো বিতর্ক জিইয়ে রাখাই বিজেপির মূল লক্ষ্য।

রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। একদিকে যখন শাসক দল বিজেপি চাইছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভাবমূর্তিতে আঘাত হানতে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বিষয়টি নিয়ে ‘গোপনীয়তার অধিকার’ এবং ‘মানবাধিকারের’ প্রশ্ন তুলে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আদায় করতে চাইছে। তবে এই মেডিক্যাল রিপোর্ট কীভাবে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর হাতে এল বা এর সত্যতা কতটা, তা নিয়ে এখনো কোনো সরকারি স্পষ্টীকরণ পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের নথি কীভাবে জনসমক্ষে এল এবং তাতে রোগীর ব্যক্তিগত সুরক্ষা কতটা বজায় রাখা হয়েছে, সেই প্রশ্নও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে। পুরো বিষয়টি বর্তমানে এক জটিল আইনি ও রাজনৈতিক সমীকরণে রূপ নিয়েছে। রাজ্যের প্রবীণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা আগামী দিনে আরও বড় আইনি লড়াইয়ের পথ প্রশস্ত করবে এবং রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও নিম্নগামী করবে।