বিলবোর্ড কাণ্ডে তলব এড়ালেন অভিষেক, চাইলেন নতুন সময়সীমা

শহরের বুকে অবৈধ বিলবোর্ড বসানো সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় কলকাতা পুলিশের তলব পেয়েও হাজিরা দিলেন না তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ঘটনাটি বর্তমানে রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জানা গিয়েছে, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মবহির্ভূতভাবে এবং যথাযথ অনুমতি ছাড়া যে বিশালাকার বিলবোর্ডগুলি বসানো হয়েছে, সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে ডাকা হয়েছিল। তবে ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে তিনি এদিন হাজিরা এড়িয়ে গিয়েছেন এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে নতুন একটি সময়সীমা চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন।

কলকাতা পুলিশের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে, বেশ কয়েকদিন আগেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই বিষয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ নির্ধারিত দিনে তাঁকে নির্দিষ্ট ভবনে উপস্থিত হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে না গিয়ে তাঁর আইনি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বার্তা পাঠান। সেই বার্তায় স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে তদন্তকারী অফিসারদের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব নয়। তবে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন এবং অতি দ্রুত অন্য একটি তারিখ নির্ধারণের জন্য পুলিশকে অনুরোধ করেছেন।

রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে, আইন সবার জন্য সমান এবং নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের নিজস্ব গতিতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের চাপে ফেলার কৌশল হিসেবেই এই ইস্যুটিকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। যদিও কলকাতা পুলিশ এই রাজনৈতিক অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশের সাফ কথা, এটি সম্পূর্ণভাবে একটি আইনি প্রক্রিয়া। শহরের সৌন্দর্যায়ন রক্ষা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার খাতিরেই নিয়ম লঙ্ঘনকারী বিলবোর্ডগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই অবৈধ কাঠামোগুলির নেপথ্যে কারা রয়েছেন বা কোন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদতে এই কাজ চলছে, তা খতিয়ে দেখাই তদন্তের মূল লক্ষ্য।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিককালে শহরের বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে একাধিক বিশালাকার বিলবোর্ড বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থা যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি যানজট সৃষ্টির ফলে পথচারীদের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই কলকাতা পুলিশ পুরসভা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে তদন্ত চালাচ্ছে। পুলিশের একটি বিশেষ দল ইতিমধ্যেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তের অবৈধ কাঠামো চিহ্নিত করেছে এবং সেগুলির মালিকানা ও অনুমতিপত্র যাচাই করার কাজ শুরু করেছে।

তৃণমূল নেতার এই হাজিরা না দেওয়ার ঘটনায় রাজ্য-রাজনীতিতে ফের উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিরোধী পক্ষ এই ঘটনাকে পুঁজি করে লাগাতার সুর চড়াচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, পুলিশ প্রশাসন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কবে পুনরায় তলব করে এবং তিনি সেই ডাকে সাড়া দেন কি না। তদন্তের গতিপ্রকৃতি আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে ওয়াকিবহাল মহলের। পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও জানানো হয়নি যে, নতুন কোনো তারিখ দেওয়া হয়েছে কি না বা এই অনুরোধ গৃহীত হয়েছে কি না। বিষয়টি নিয়ে আইনি মহলেও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে শহরে বিলবোর্ড সংক্রান্ত বিতর্কে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ নাগরিক মহলেও নানা ধরনের প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ মনে করছেন, আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া পুলিশের কর্তব্য, আবার অন্য একটি অংশ এই পুরো বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক সমীকরণের গন্ধ পাচ্ছেন। শহরবাসীর এখন একটাই দাবি, শহরের নিরাপত্তা ও সৌন্দর্যায়নের স্বার্থে যে পদক্ষেপ নেওয়া হোক না কেন, তা যেন নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই তদন্ত কোন পর্যায়ে পৌঁছায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেটাই এখন রাজনীতির অলিন্দে আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু। পুরো ঘটনাটি একদিকে যেমন আইনি লড়াইয়ের রূপ নিচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে এটি রাজ্যের শাসকদলের সঙ্গে বিরোধী শিবিরের বিরোধের নতুন অধ্যায় উন্মোচন করল। তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এখন কলকাতা পুলিশের কাছেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।