কলকাতার অন্যতম প্রধান সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে আবারও চিকিৎসার গাফিলতি এবং ভুল চিকিৎসার গুরুতর অভিযোগ উঠল। বুধবার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে হাসপাতাল চত্বর। মৃত শিশুর পরিবারের দাবি, সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে এবং চিকিৎসকদের গাফিলতির কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের একবার রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার মান, চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতা এবং সরকারি হাসপাতালের সার্বিক ভূমিকা নিয়ে জনমানসে গভীর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, বুধবার শিশুটিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আরজি কর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন তার অসহায় পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের অভিযোগ, জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর থেকেই চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে যে ধরনের তৎপরতা প্রয়োজন ছিল, তা একেবারেই পরিলক্ষিত হয়নি। সময়মতো চিকিৎসা শুরু না হওয়ায় শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। পরিবার অভিযোগ করছে, একাধিকবার চিকিৎসকদের কাছে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা সময়মতো রোগীকে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। শেষ পর্যন্ত শিশুটির মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যদের বুকফাটা আর্তনাদ আর অভিযোগের সুর একটাই— যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা সময়মতো ব্যবস্থা নিতেন, তবে শিশুটিকে হয়তো বাঁচানো সম্ভব হতো। চিকিৎসার চরম গাফিলতি এবং অবহেলার কারণেই এই মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছে বলে তারা দৃঢ়ভাবে দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের দাবি, শিশুটিকে যখন হাসপাতালে আনা হয়েছিল, তখন তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং সংকটাপন্ন ছিল। চিকিৎসকরা তাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন এবং প্রোটোকল মেনেই চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিকিৎসার গাফিলতির যে অভিযোগ উঠেছে, তাকে তারা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, সমস্ত নিয়ম মেনে এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত বিধি অনুসরণ করেই পরিষেবা প্রদান করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে শিশুটির মৃত্যু হলো, তার কোনো বিস্তারিত মেডিক্যাল রিপোর্ট বা ময়নাতদন্তের তথ্য এই মুহূর্তে জনসমক্ষে আসেনি, যার ফলে ধোঁয়াশা কাটছে না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বুধবার দীর্ঘক্ষণ উত্তেজনা বজায় ছিল। মৃত শিশুর আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দোষী চিকিৎসকদের কঠোর শাস্তির দাবি তোলেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখে হাসপাতালের সুরক্ষা কর্মীরা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষমেশ পুলিশি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। শোকস্তব্ধ পরিবারের কান্না এবং ক্রমাগত প্রতিবাদের জেরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের করিডোরে সাময়িকভাবে অত্যন্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যার ফলে অন্যান্য রোগীদের পরিষেবাপ্রাপ্তিতেও বিঘ্ন ঘটে।
প্রসঙ্গত, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের বিতর্ক এবং গাফিলতির অভিযোগ সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো এবং চিকিৎসকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই ধরনের অভিযোগ বারংবার ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ বাড়ছে। চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে করা এই গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করবে কি না, তা নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্রের দাবি, তারা সবসময়ই রোগীদের সর্বোচ্চ পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং প্রতিটি অকাল মৃত্যুর কারণ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা হয়। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, সরকারি হাসপাতালের এই ধরনের উদাসীনতা এবং দায়সারা মনোভাব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল চত্বরে এখনো চরম উত্তেজনা রয়েছে এবং নিরাপত্তার খাতিরে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এই ঘটনায় ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে চূড়ান্ত সত্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো বাকি রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের নজর এখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। এই ধরনের ঘটনা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে নামিয়ে দেয়, যা অনতিবিলম্বে সংশোধন করা প্রয়োজন।






