কলকাতা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে সাময়িক স্বস্তি পেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আমতলায় অবস্থিত তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়টি ভাঙার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, আপাতত তার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে উচ্চ আদালত। শনিবার ছুটির দিনে এক জরুরি শুনানির মাধ্যমে বিচারপতি এই নির্দেশ দিয়েছেন। মূলত আইনি জটিলতা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন আবেদনকারীরা। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই এলাকায় কোনো রকম ভাঙচুর বা নির্মাণ অপসারণের কাজ করা যাবে না।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার বিকেলে। আমতলার ওই জমি ও কার্যালয় সংক্রান্ত নথিপত্রে গরমিল রয়েছে— এই অভিযোগে স্থানীয় প্রশাসন ও ভূমি দপ্তরের তরফে তড়িঘড়ি উচ্ছেদ অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠে যে, পর্যাপ্ত আইনি নোটিশ ছাড়াই বুলডোজার নিয়ে ভাঙার কাজ শুরু করতে উদ্যোগী হয়েছিল সংশ্লিষ্ট দপ্তর। এরপরই বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতিকে জরুরি শুনানির আর্জি জানানো হয়। ছুটির দিনেও আদালতের এই তৎক্ষণাৎ তৎপরতা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রশাসনিক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে নিয়ম মেনে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা একান্তই আবশ্যিক। কেন ছুটির দিনে এত তড়িঘড়ি এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছিল, সেই বিষয়েও রাজ্য প্রশাসনের কাছে সদুত্তর দাবি করেছে উচ্চ আদালত।
আইনজীবীদের একাংশের মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও সরকারি পক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন যে, এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে হাইকোর্ট আপাতত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়ায় ওই কার্যালয়টি আপাতত সুরক্ষিত রয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ফের বিস্তারিত শুনানি হতে পারে বলে আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে। ওই দিন পর্যন্ত কোনো পক্ষই কোনো নতুন পদক্ষেপ নিতে পারবে না। আদালতের এই হস্তক্ষেপে শাসকদলের অন্দরে স্বস্তির হাওয়া লক্ষ্য করা গেছে।
আমতলার স্থানীয় বাসিন্দা ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রচুর মানুষ সেখানে জড়ো হন। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশ কার্যকর করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয় ঘিরে এই আইনি লড়াই এখন রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতের পরবর্তী শুনানি কী হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সব পক্ষ।
প্রাথমিক পর্যায়ে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট কার্যালয়টি তৈরির সময় প্রয়োজনীয় অনুমতি বা নথিপত্রে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশাসন প্রশ্ন তুলেছিল। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণ হলো, আইনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভবন ভাঙার আগে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দেওয়া উচিত ছিল। প্রশাসনের তরফ থেকে যে তড়িঘড়ি দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালত সেই প্রক্রিয়ায় আপাতত দাঁড়ি টেনে দিয়েছে।
আদালত সূত্রে আরও জানা গিয়েছে যে, উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ খতিয়ে দেখা হবে। পরবর্তী শুনানির দিন প্রশাসনকে সমস্ত নথিপত্র আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে। এখন আমতলার ওই কার্যালয়ে কোনো ভাঙচুর বা উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চলবে না, এমনটাই নিশ্চিত করেছেন আদালতের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তরফে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন আদালতের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। বিস্তারিত আইনি নথি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক তথ্যাদি খতিয়ে দেখার পরেই আগামী শুনানিতে আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঘটনাটি বর্তমানে রাজ্য রাজনীতির উত্তাপ অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আইনি ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা আদালতের পরবর্তী রায়ের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। তৃণমূল নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য না পাওয়া গেলেও, আদালতের এই রায়ে তারা যে অনেকটা নিশ্চিন্ত, তা তাদের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট। আইন ও প্রশাসনের সংঘাতের এই নতুন পর্বে শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় কী হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আমতলার ওই কার্যালয়ের ভবিষ্যৎ।








