সল্টলেক সেক্টর ফাইভের রেস্তোরাঁ ও অফিসপাড়ায় রান্নায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর

কলকাতার তথ্যপ্রযুক্তি জগতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সল্টলেক সেক্টর ফাইভ। প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষের পদচারণায় মুখরিত এই এলাকাটি এখন রাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে এই ঘিঞ্জি এবং ব্যস্ত এলাকাটির জননিরাপত্তা এবং অগ্নি-নির্বাপক ব্যবস্থা নিয়ে গত বেশ কিছু সময় ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ এবং দমকল দপ্তরের বিশেষজ্ঞরা। এই প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বড় ধরনের কোনো অগ্নিকাণ্ড রোধের লক্ষ্য নিয়ে সেক্টর ফাইভ এলাকায় খোলা জায়গায় কিংবা খোলা আগুনের শিখা ব্যবহার করে রান্নাকাজ চালানোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নবান্ন এবং বিধাননগর পুরনিগমের তরফ থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, গত সোমবার থেকেই এই কড়া নিয়ম বলবৎ করা হয়েছে।

মূলত সেক্টর ফাইভের উচ্চবিত্ত অফিস ভবন, বহুতল এবং রাস্তার ধারের ছোট-বড় খাবারের দোকানগুলোতে যাতে কোনোভাবেই অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা না ঘটে, সেই লক্ষ্যেই এই সময়োপযোগী নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছিল, সেক্টর ফাইভের বিভিন্ন সংযোগকারী গলি এবং জনবহুল ফুটপাতে যত্রতত্র গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে দেদার রান্না করা হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই দোকানগুলোতে যথাযথ অগ্নি-নির্বাপক ব্যবস্থা নেই, নেই কোনো অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের পর্যাপ্ত জোগান। অথচ, কয়েক হাত দূরেই দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর জন্য এই ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত এক বড়সড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিরাজ করছিল। অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে এবং এলাকাটিকে প্রকৃত অর্থে ‘ফায়ার সেফ’ বা অগ্নি-সুরক্ষিত করে তুলতে রাজ্য সরকার ও দমকল দপ্তরের পক্ষ থেকে অতীতে একাধিকবার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। সেই সতর্কবার্তাগুলোকে কার্যত মান্যতা দিয়েই সোমবার থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।

বিধাননগর পুরনিগমের শীর্ষস্থানীয় এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “সেক্টর ফাইভ আজ আর কেবল একটি আইটি হাব বা তথ্যপ্রযুক্তি তালুক নয়, এখানে প্রতিদিন কয়েক লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে। এই অত্যন্ত ঘিঞ্জি এবং জনবহুল এলাকায় যদি কোনো একটি ছোট দোকানের রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণ ঘটে, তবে তার ভয়াবহতা গোটা এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেই ঝুঁকি কোনোভাবেই প্রশাসন নিতে পারে না। তাই জনস্বার্থে ঝুঁকি এড়াতে এখন থেকে আর কোনোভাবেই খোলা শিখা ব্যবহার করে রান্না করা চলবে না।” তিনি আরও স্পষ্টভাবে জানান যে, বিশেষ করে যে সমস্ত ভবনে কেন্দ্রীয় রান্নার ব্যবস্থা নেই বা যে সমস্ত রেস্তোরাঁ নিরাপত্তা বিধি মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইতিমধ্যেই এলাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, ছোট খাবারের দোকান ও ক্যান্টিনগুলোকে প্রশাসনিক নোটিশ ধরানো হয়েছে। নির্দেশিকায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো দোকান বা অফিস কর্তৃপক্ষ এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে তাদের রান্নাঘর পরিচালনা করতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই দমকল দপ্তরের যথাযথ ফায়ার সেফটি লাইসেন্স এবং অনাপত্তি পত্র বা এনওসি থাকতে হবে। সাধারণ কাঠ বা কয়লার চুল্লি তো দূরের কথা, অনিরাপদ উপায়ে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিয়ম অমান্য করলে মোটা অঙ্কের জরিমানা এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে প্রশাসনের তরফ থেকে।

যদিও এই সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় ছোটখাটো খাবার দোকানের মালিকদের মধ্যে এক তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দাবি করছেন যে, তাদের পক্ষে হঠাত করে আধুনিক ইলেকট্রিক ওভেন বা উন্নত রান্নার সরঞ্জামে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়, কারণ তাদের অন্য কোনো রান্নার ব্যবস্থা নেই। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো অবস্থাতেই আপস করা হবে না। এই নিয়ম কার্যকর করতে সোমবার থেকে সেক্টর ফাইভের বিভিন্ন ব্লকে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি শুরু করেছেন পুরনিগমের প্রতিনিধিরা।

বর্তমানে পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যদি কোনো রেস্তোরাঁ বা দোকান নিয়ম ভেঙে গোপনে ব্যবসা চালায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের রান্নাঘর সিল করে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশ ও দমকল কর্মীদের একটি যৌথ দল প্রতিনিয়ত এলাকা ঘুরে দেখছেন। প্রশাসনের এই কড়া মনোভাবকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেক অফিসকর্মীই। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই সেক্টর ফাইভের ঘিঞ্জি পরিবেশে আগুনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার আতঙ্ক তাদের পিছু ছাড়ছিল না। এবার অন্তত সেই আতঙ্ক থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মিলবে বলে তারা আশা করছেন। তবে এই নিয়ম দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর থাকে এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কোনো বিকল্প বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সরকার করে কি না, তা নিয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর এখন নির্ভর করছে, তথ্যপ্রযুক্তির এই রাজধানী কতটা দ্রুত এবং কতটা সফলভাবে অগ্নিনির্বাপক নিয়ম মেনে একটি আদর্শ সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে পারে। শহর কলকাতার জননিরাপত্তার খাতিরে এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে সচেতন নাগরিক সমাজ।