কলকাতার ঐতিহ্যবাহী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (এনআরএস) নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ এই চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীদের ভিড় যেমন থাকে, তেমনই থাকে সার্বক্ষণিক কর্মব্যস্ততা। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ক্যাম্পাসের ভেতরে অকারণে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ এবং তাদের অভব্য আচরণের জেরে হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই সমস্যার প্রতিবাদে বর্তমানে সরব হয়েছেন জুনিয়র চিকিৎসকরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং হাসপাতালের স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অবশেষে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছে এনআরএস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গত কয়েকদিন ধরে চলা এই অশান্তির জেরে একদিকে যেমন জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে পড়ুয়াদের পড়াশোনার পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের।
সোমবার সকালে এই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, দিনের বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগ এবং জরুরি বিভাগের আশপাশে এমন কিছু ব্যক্তিকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে, যাদের সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা, রোগী বা পঠনপাঠনের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক নেই। এই বহিরাগতরা প্রায়শই রোগীদের অসহায় আত্মীয়দের সঙ্গে অকারণে বচসায় জড়িয়ে পড়ছেন এবং কর্তব্যরত চিকিৎসকদের কাজে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করছেন। এর আগে একাধিকবার হাসপাতাল নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গেও তাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে, যা রীতিমতো উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্দোলনরত চিকিৎসকদের স্পষ্ট দাবি, এনআরএস চত্বরে বহিরাগতদের এই অবাধ যাতায়াত নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড়সড় ফাঁকফোকরকে চোখের সামনে তুলে ধরেছে। তারা অবিলম্বে ক্যাম্পাসের প্রবেশপথগুলোতে নিরাপত্তা কড়াকড়ি বাড়ানোর এবং যথাযথ পরিচয়পত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে ভেতরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। পড়ুয়াদের অভিযোগ, বারবার এই বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসনকে অবগত করা সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট বা স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যার ফলস্বরূপ বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য বর্তমানে চরমে পৌঁছেছে।
হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখার জন্য ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া জোরকদমে চলছে। পুলিশের কাছে দায়ের করা লিখিত অভিযোগে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, বহিরাগতদের এই ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা পুরোপুরি নষ্ট করছে। নিরাপত্তা রক্ষীদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি হাসপাতালের প্রধান গেটগুলোতে নজরদারি আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় সূত্রের খবর, গতকাল রাতেও বহিরাগতদের সাথে একদল পড়ুয়ার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর ঠিক পরপরই ক্ষুব্ধ জুনিয়র চিকিৎসকরা একজোট হয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যতক্ষণ না নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি ঢেলে সাজানো হচ্ছে এবং বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করা হচ্ছে, ততক্ষণ তারা তাদের এই প্রতিবাদী কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। নিরাপত্তার স্বার্থে হাসপাতালের ভেতরে নিয়মিত পুলিশি টহলদারি বাড়ানোর আবেদনও প্রশাসনের কাছে জানানো হয়েছে।
ঘটনার জেরে শহরের সমগ্র চিকিৎসা মহলে গভীর উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে। সরকারি হাসপাতালের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গায় এভাবে বহিরাগতদের আধিপত্য ও দাপট কেন বাড়ছে, তা নিয়ে সচেতন মহলে বড় প্রশ্ন উঠছে। হাসপাতালের প্রশাসনিক আধিকারিকরা জানিয়েছেন যে, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। পুলিশের সাহায্য নেওয়া হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। রোগীদের সুরক্ষার খাতিরে হাসপাতালের ভেতরে কঠোর নিয়মবিধি ও বিধিনিষেধ খুব দ্রুত বলবৎ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের জন্য পুলিশের একটি বিশেষ দল আজ এনআরএস পরিদর্শন করেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার পর পুলিশ আশ্বাস দিয়েছে যে, দোষীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে পড়ুয়ারা কেবল মৌখিক আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে নারাজ; তারা বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত ঘটনার জেরে হাসপাতালে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন মোড়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তা কর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরও কড়া নজর রাখছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে। রোগীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে এবং চিকিৎসক ও পড়ুয়াদের কাজের স্বচ্ছ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য প্রশাসন কতটা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।








