China Iran Conflict: কেন ইরান প্রসঙ্গে নীরব চিন? জানুন নেপথ্য কাহিনী

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রণংদেহি আবহে সবথেকে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে চিনের ভূমিকা। যখন গাজা বা লেবানন ইস্যুতে ইরান ও ইজরায়েল সরাসরি যুদ্ধের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চিন আশ্চর্যজনকভাবে চুপ। তবে এই নীরবতা কোনোভাবেই উদাসীনতা নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত কূটনৈতিক চাল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেজিংয়ের জন্য এই মুহূর্তে সবথেকে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)। এই সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন এবং চিনের জ্বালানি নিরাপত্তার চাবিকাঠি। চিনের মোট খনিজ তেল আমদানির সিংহভাগ আসে এই মধ্যপ্রাচ্য থেকে। পরিসংখ্যান বলছে, চিনের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪৪ শতাংশই আসে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে। যদি ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হয় এবং তার ফলে হরমুজ প্রণালী কোনোভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে চিনের অর্থনীতিতে ধস নামতে বাধ্য। আর ঠিক এই কারণেই চিন কোনো এক পক্ষ নিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে চাইছে না। বেজিং খুব ভালো করেই জানে যে, ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও ইজরায়েলের সঙ্গে তাদের প্রযুক্তিগত ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একদিকে যেমন চিন ইরানের কাছ থেকে সস্তায় তেল পায়, অন্যদিকে ইজরায়েলের হাই-টেক শিল্পে চিনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে কোনো একটি দেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে অন্য দেশের বিরাগভাজন হওয়া বেজিংয়ের বর্তমান লক্ষ্য নয়। এছাড়া আমেরিকার সঙ্গে চিনের যে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা চিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। চিন চাইছে নিজেকে একজন ‘শান্তিস্থাপনকারী’ হিসেবে তুলে ধরতে, ঠিক যেমনটা তারা সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার সময় করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান ইস্যুতে মুখ খোলা মানেই ইজরায়েল ও পশ্চিমি দুনিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো, যা এই মুহূর্তে চিনের অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখকর হবে না। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে চিনের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যা বিশ্ববাজারে তাদের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। তাই ৪৪ শতাংশ তেল আমদানির সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন জিনপিং প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। এই সংকটের আবহে চিন একদিকে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার কথা বলছে, আবার অন্যদিকে তলে তলে নিজেদের জ্বালানি ভাণ্ডার ভরার চেষ্টা চালাচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর দিয়ে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ তেলের জাহাজ চিনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চিন এখন আন্তর্জাতিক স্তরে কোনো বড় সংঘাতে জড়াতে চাইছে না। এই নীরবতাই আসলে চিনের সবথেকে বড় প্রতিরক্ষা কবচ। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যত বাড়বে, চিনের ওপর চাপ ততটাই বাড়বে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর জল শান্ত আছে এবং তেলের যোগান অব্যাহত আছে, ততক্ষণ চিন সম্ভবত এই ‘স্ট্র্যাটেজিক সাইলেন্স’ বা কৌশলগত নীরবতা বজায় রাখবে। চিনের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, বিশ্ব রাজনীতিতে আদর্শের চেয়েও অনেক সময় বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং জ্বালানি নিরাপত্তাই চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। বেজিংয়ের এই ধীরলয়ে চলা নীতি আন্তর্জাতিক মহলে তাদের প্রভাব কতটা বাড়াবে বা কমাবে, তা সময়ই বলবে।